কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
অপসাংবাদিকতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থকেলেঙ্কারির অভিযোগে মো. ইমরান হোসেনকে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম পলাশ তার ফেসবুক পোস্টে ইমরান হোসেনকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি।
সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ সদরের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ে সদর উপজেলার একজন ইউপি চেয়ারম্যান এর কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, ইটনায় চিকিৎসকসংক্রান্ত সংবাদে টাকা নেয়া ও একরামপুরের একটি মিষ্টির দোকান থেক টাকা নেয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইমরান হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে আসছিলো। এসব অভিযোগের মধ্যে তদন্তে কয়েকটির প্রমাণ পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় কমিটি ও জেলা কমিটির সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে তাকে স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষি অফিসের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, ইমরানসহ কয়েকজন সাংবাদিকের প্রধান হাতিয়ার তথ্য অধিকার আইনের আবেদন ফরম। তার দাবি, তারা ব্যাগভর্তি ফরম নিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গিয়ে বিগত কয়েক অর্থবছরের নানা তথ্য চায়, যা সংগ্রহ করে দেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য সময়সাপেক্ষ ও জটিল হয়ে পড়ে। ওই কর্মকর্তার আরও অভিযোগ, পরে তারা তথ্য অধিকার আইনের আবেদন না দিয়েই ‘’সম্মান করার’’ কথা বলে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে। দাবি অনুযায়ী অর্থ না পেলে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে পুনরায় টাকা বা একই তথ্য চাওয়া হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এক ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তার অভিযোগ , ইমরান ও তার সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজন সাংবাদিক বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে কর্মকর্তাদের অপ্রাসঙ্গিক তথ্য চেয়ে বিব্রত করেন। তার ভাষ্য, অফিসে দীর্ঘ সময় বসে অবান্তর প্রশ্ন করার পর একপর্যায়ে তারা মোটরসাইকেলের “তেল খরচদাবি করেন। বিরক্ত হয়ে অনেক সচিব অল্প কিছু অর্থ দিতে বাধ্য হন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও জানান, সরকারি কোনো অফিসে তাদের জন্য ব্যক্তিগত টাকাও বের করে নেওয়া যায় না। তারা ক্যামেরা বের করে রাখেন। তাদের ভয়ে কখন কী পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা নিয়ে তার আতঙ্কে থাকেন। তার দাবি, এই চক্রটি বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে সাংবাদিকতার নামে একই ধরনের চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ প্রাণীসম্পদ দপ্তরের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, কর্মকর্তার কক্ষে এসি কেন, সেই প্রশ্নের জবাবও তারা চান। সকাল থেকে অফিস সময় পর্যন্ত শুধু হাসপাতাল নয়, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তাদের ঘুরাফেরা করতে দেখা যায়।
আল ইসলাম নামে এক চিকিৎসক অভিযোগ করেন, ইমরান হোসেন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের সামনে চিকিৎসকদের সনদ দেখার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। আমার জানা মতে একজন সাংবাদিক সাধারণত একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কিন্তু তিনি ৬-৭ প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দেন। এটি কীভাবে সম্ভব, তা বুঝে আসে না।
তবে অভিযোগ ও বহিষ্কারের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন ইমরান হোসেন। তিনি জানান, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার কার্যালয়ে একাদিক মিটিং করলেও কমিটিতে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তাকে আগে থেকে অবহিত করা হয়নি। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে তার নাম থাকলেও তিনি ওই কমিটির সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত নন।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলোর কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না।
এ বিষয়ে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম পলাশ বলেন,কমিটির শুরু থেকেই একটাই কথা ছিলো, কমিটির কেউ যদি হলুদ-সাংবাদিকতা বা অপ সাংবাদিকতার সাথে জড়িত থাকে, তাহলে তাকে প্রমাণ মিললেই তাৎক্ষনিক বহিস্কার করা হবে। আর কমিটি গোপনে প্রকাশ করা হয়নি। বার বার সংগঠনের কার্যালয়ে মিটিং করে প্রত্যেক সদস্যের ছবি ও পদের নামসহ সর্বসম্মতিক্রমেই কমিটি প্রকাশ করা হয়েছে। এতদিন ইমরান এ বিষয়ে কোনো আপত্তি জানাননি। দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ আমাদের কাছে আসে। অভিযোগগুলোর তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার পরই বহিস্কারের আভাব পেয়ে কমিটিতে পদ অস্বীকার করার পায়তারা করে। পরে কেন্দ্রীয় কমিটি ও জেলা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শহীদুল ইসলাম পলাশ আরও জানান, বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে আজ থেকে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার কোনো সম্পর্ক নেই। সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ প্রতারিত হলে তার দায় সংগঠন নেবে না।
সাংবাদিক আতাউর রহমান জানান, ইমরান মূলত কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা নন। জেলার এবং জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের ইজ্জত,সম্মান নিয়ে তার কোনো ধরনের মাথাব্যথা নেই। প্রায় ৮-১০ বছর আগে ঝলকাটিতে মামলায় জড়িয়ে পড়লে কিশোরগঞ্জ শহরে এসে একটি স্থানীয় প্রিন্টিং প্রেসে চাকরির সুবাদে ঝালকাঠি জেলা থেকে কিশোরগঞ্জে এসে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক ভাষা ও কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়ে ওঠেন।
এছাড়া আওয়ামী-লীগ সরকারের পরিবর্তনের পর মুভি বাংলা টেলিভিশন, দৈনিক আমার সংবাদ, দৈনিক জনবাণী, দৈনিক সংবাদ সারাবেলা, রাজধানী টিভি ও কিশোরগঞ্জ পোস্টসহ একাধিক গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে কিশোরগঞ্জের সাংবাদিকতায় নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন ইমরান হোসেন। কিন্তু এখন বিভন্ন অভিযোগে হলুদ সাংবাদিক হিসেবে বেশি পরিচিত হয়েছে।


















