আজ ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

তালেবানের আশ্বাস সত্ত্বেও শঙ্কায় বিশ্ব

Spread the love

আন্তর্জাতিক ডেস্ক.
গত ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী তালেবান। তবে ২০ বছর পর আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবানের ফেরাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে পারছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের ধারণা, আফগানিস্তান আবারও হয়তো হয়ে উঠবে জঙ্গিদের আখড়া।

বিশ্লেষকদের শঙ্কা, তালেবানের সঙ্গে আল-কায়দার সম্পর্ক এখনো রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গেও তালেবানের সখ্য রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তালেবানের শীর্ষ নেতা সিরাজউদ্দিন হাক্কানির কথা। তিনি জঙ্গিগোষ্ঠী হাক্কানি নেটওয়ার্কেরও প্রধান। তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য ৫০ লাখ ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনালের সিকিউরিটি অ্যান্ড কোঅপারেশনের দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিভাগের বিশেষজ্ঞ আসফান্দিয়ার মীর বলেন, তালেবান আফগান জয় করার কারণে জিহাদিরা আরও উজ্জীবিত হবে। তালেবানসহ দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশির ভাগ জিহাদীগোষ্ঠী একে নিজেদের বিজয় বলে মনে করছে।

আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো তালেবান ক্ষমতায় আসার পর এরই মধ্যে তাদেরকে অভিনন্দন বার্তা দিয়েছে। এদের মধ্যে সোমালিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী আল–শাবাব অন্যতম।

ইয়েমেনের বিদ্রোহীগোষ্ঠী হুতিরাও তালেবান ক্ষমতায় আসার পর বলেছে, আফগানিস্তান আবারও প্রমাণ করল যে, বিদেশি দখল ব্যর্থ হতে বাধ্য করেছে তারা। এই দলটিও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির বিরোধিতা করে।

এদিকে পাকিস্তানের তালেবান গোষ্ঠীও আফগানিস্তানে তালেবান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় বেজায় খুশি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আফগান নিয়ন্ত্রণে আনার পর পাকিস্তানের তালেবানের অনেক সদস্যকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে তালেবান। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের ক্ষমতায় থাকা কট্টরপন্থী তালেবানকে এবার আর দেখা যাবে না বলেও অনেকেই মত দিয়েছেন। পাশাপাশি চীন, যুক্তরাজ্য, তুরস্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে।

গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তালেবানের মুখপাত্র যাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, কারও ক্ষতি করা হবে না। আমাদের এই ভূখণ্ডকে কারও বিপক্ষে কাজ করার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গত মাসে বিশেষজ্ঞদের দেওয়া একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আল–কায়েদা আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে ১৫টিতেই অবস্থান করছে।

বিশেষজ্ঞরা ওই প্রতিবেদনে আরও বলেন, আফগানিস্তানে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটও (আইএস) তাদের উপস্থিতি সম্প্রসারিত করছে। যদিও ইসলামিক স্টেট তালেবানবিরোধী। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ সাবধান করে বলেছেন, এই ধরনের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো যেকোনো সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আফগানিস্তানের বৈশ্বিক সন্ত্রাসের হুমকি ঠেকানোর জন্য নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চীনবিরোধী ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্টের (ইটিআইএম) সঙ্গে তালেবান সম্প্রতি বৈঠক করেছে। আর এ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে চীনও।

তবে তালেবান চীনকে আশ্বস্ত করেছে যে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কেউ চীনে হামলা চালাতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ইটিআইএম সংগঠনটিই চীনে উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের বিরোধিতা করে আসছে। যদিও চীন উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে।

তালেবান আফগান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি জঙ্গি হুমকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এ নিয়ে আসফান্দিয়ার মীর বলেন, পাকিস্তানের তালেবানের ঘাঁটি আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে। এই সংগঠন পাকিস্তানের ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা পাকিস্তানের তালেবানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের সাবেক সেকেন্ড ইন কমান্ড মৌলভি ফাকির মুহাম্মদসহ ৭৮০ জনকে আফগান কারাগার থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

এ নিয়ে তালেবানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। পাকিস্তানের তালেবান ২০১৪ সালে পেশোয়ারে একটি স্কুলে ভয়াবহ হামলা চালায়। ওই হামলায় ১৪০ জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল শিশু।

তবে সম্প্রতি তেমন কোনো তাণ্ডব চালাতে পারেনি পাকিস্তানের এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। জানা গেছে, আফ-পাক সীমান্তে নতুন করে আবারও দল ভারী করছে তেহরিক-ই-তালেবান।

বেলজিয়ামভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের সহযোগী পরিচালক জর্জ রিকেলসের মতে, তালেবান এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চায়। আর এ জন্য তারা এখন তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা করবে, যাতে আফগানিস্তান জঙ্গিদের ঘাঁটি না হতে পারে। তবে তিনি শঙ্কিত এই ভেবে যে, তালেবানের আফগান ক্ষমতা দখল জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে উজ্জীবিত করেছে।

জর্জ রিকেলস বলেন, কট্টরপন্থী চিন্তাধারা, পাহাড়ি অঞ্চলে বীরত্ব প্রদর্শন, সামরিক সফলতা, সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রকে হারানো—সব মিলিয়ে তালেবানকে নিয়ে আফগান তরুণ এবং জঙ্গি সদস্যদের মধ্যে অনেক গল্প ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের এ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রস্তুতি নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     সম্প্রতি প্রকাশিত আরো সংবাদ