আজ ৩১শে আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৬ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

রাজনৈতিক মতপার্থক্যের উর্ধ্বে জাতীয় শোক দিবস  গাজী মহিবুর রহমান

Spread the love

গাজী মহিবুর রহমান, কলাম লেখক :

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫। শ্রাবণের সেই মেঘাচ্ছন্ন দিনে পূবের আকাশে রক্তিম সূর্য গাল ভারী করে হলেও ঠিকই উঠেছিলো পৃথিবীর নিয়ম মেনে। অস্তও গিয়েছিল অন্যান্য দিনের মতো। কিন্তু বাংলাদেশ নামক জাতি রাষ্ট্রটি যে সূর্য সন্তানের হাত ধরে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছিলো বাঙ্গালীর সেই সূর্য সন্তানকে এইদিনে চিরতরে অস্তমিত করেছিলো কিছু কুলাঙ্গার। সেই যে রাজনীতির আদর্শিক সূর্য ডুবে ছিলো ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারের বাঙ্গালীর আশ্রয়স্থল খ্যাত ঐতিহাসিক বাড়িটিতে তার বিন্দুমাত্র আলোক ছটাও এখনকার ভোগবাদী রাজনীতিতে আর চোখে পড়ে না। রাজনীতির কবিকে হত্যার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কবিতার পটভূমি পাল্টে দেওয়া হয়েছে। তাই তো কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, কবি হীন এই বিমূখ প্রান্তরে আজ কবির বিরুদ্ধে কবি।

ঘাতকরা একসাথে একই গৃহে একই পরিবারের এত জন মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে মূলত একটি আদর্শকেই হত্যা করতে চেয়ছিলো। পুরোপুরি না পারলেও অনেকাংশেই তারা সফল হয়েছিলো। ভাগ্যচক্রে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর দুই তনয়া নিরন্তর চেষ্টা করে চলেছেন পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ করতে।

এমন একটি হত্যাকাণ্ডের পর যখন প্রচণ্ড বিক্ষোভে, বিদ্রোহে ফেঁটে পড়ার কথা ছিলো তখনকার আওয়ামী রাজনীতিবিদ কিংবা মুজিব প্রেমীদের, কিন্তু বিশ্ব দেখলো তার উল্টো চিত্র। ব্যাপক প্রতিবাদ তো দূরে থাক, প্রায় আট কোটি মানুষের দেশে কিছু বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ হাতেগোনা কয়েকজন নেতৃস্থানীয় মানুষ স্থানীয় পর্যায়ে করেছিলেন। তাছাড়া বাকি মোটামুটি অনেকেই ঘাতক খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন কিংবা চুপ থেকেছিলেন।

এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জাতীয়ভাবে কোন প্রতিবাদ কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হয়েছিলো তখনকার কোন রাজনৈতিক দল। পরিবেশ প্রতিকুল ছিল এ কথা সত্যি কিন্তু আইয়ুবের সামরিক শাসন যে জাতি মেনে নেয় নাই, বৃটিশদের রক্ত চক্ষু যে জাতি বরদাশত্ করে নাই সে জাতি তাদের জনককে এমন নির্মমভাবে হারিয়ে প্রতিবাদ করবে না তা কি করে হয়!

বাংলাদেশের রাজনীতির আদর্শিক দ্বন্দ্বের একটি অধ্যায় রচিত হয়েছিল এই ১৫ আগস্টে। রাজনৈতিক মেরুকরণের অন্যতম একটি দিনও এই ১৫ আগস্ট। এই দিনে জাতি মর্মাহত চিত্তে শোক দিবস পালন করে। যেটি বর্তমানে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রও পালন করে।

আবার দীর্ঘদিন দেখেছি কেউ কেউ ব্যাপক উল্লাসে বিতর্কিত জন্মদিনও পালন করে এই ১৫ আগস্টে।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, বাঙ্গালীর মুক্তির কাণ্ডারী বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সঠিকভাবে জানাশুনা ও মূল্যায়নকারী মানুষের কাছে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বাঙ্গালী জাতীর জীবনে একটি কালো অধ্যায় এবং নিঃসন্দেহে শোকের দিন। ওইদিন বিষাদে ছেয়ে গিয়েছিল বাংলার আকাশ বাতাস। মুজিব আদর্শে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের চোখের নোনা জলে ভেসে গিয়েছিল প্রসারিত বুক, যা স্মরণ করে এখনও অনেকে বুক ভাসান।

এরই মধ্যে ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার কাজ সম্পন্ন হয়েছে কয়েকজনের রায় কার্যকরও করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে রাষ্টীয়ভাবে পালন করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলে ১৫ আগস্ট আর জাতীয় শোক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয় বা সরকারিভাবে পালন করা হয় না। বরং তখন জাতি এমনও দেখেছে ধুমধাম করে জন্মদিন পালন করা হচ্ছে।

টানা তিনবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণে শোক দিবসে উদ্দেশ্যমূলক জন্মদিন পালন করা রাজনৈতিক পক্ষের অবস্থা বর্তমানে অনেকটাই কোনঠাসা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনার ফলে আগের মতো আর তথাকথিত জন্মদিন পালনের এতো সাজ সাজ রব দেখা যায় না। যদিও তারা এমন ঘোষণা দেননি যে তারা ভবিষ্যতে কখনও ক্ষমতায় গেলে ১৫ আগস্ট যেহেতু জাতির জনককে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে কাজেই এই দিনে আর যাই হোক ঘটা করে বিতর্কিত জন্মদিন পালন করা থেকে বিরত থাকবে এবং দিবসটিকে তারা জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করবে।

বর্তমানে অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ মান-মর্যাদার সাথে জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়। আপামর জনগণের মাঝেও দিবসটি পালন এবং দিবসের তাৎপর্য অনুধাবন করার একটি সার্বজনীন প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

কিন্তু বর্তমানে একটি বিষয় খুবই লক্ষণীয় এই দিবসটিকে ঘিরে একধরনের সুবিধাবাদী অত্যোৎসাহী শ্রেণি তৈরি হয়েছে যারা শোক দিবসের নামে নিজেদের প্রচার করার অর্থাৎ আত্মপ্রচারের একটি উপলক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে এই দিবসটিকে। শোক দিবসের প্রচার প্রচারণা যে কেউ করতেই পারে বরং করাটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু জাতীয় শোক দিবসে ব্যানার পোস্টারে অনেক ক্ষেত্রেই দেখি শোক দিবসের ভাবমুর্তি ফুটে উঠার বদলে ক্ষুন্ন হচ্ছে দিবসের তাৎপর্য অন্যদিকে নিজেকে জাহির করার একটা সুযোগ প্রচারকারীরা নিচ্ছে।

বিশ্ব মানচিত্রের এই যে অঞ্চলটি যেখানে আমরা, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা, তাদের পূর্ব পুরুষেরা বংশ পরম্পরায় হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছিল; যাদের বসবাসের জন্য ভু-খন্ড ছিল, নিজস্ব ভাষা ছিল, সংস্কৃতি ছিল আর অগনিত মানুষ তো ছিলই।

কিন্তু নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এমনকি ভূ-খন্ড থাকার পরেও বিশ্ব দরবারে নিজস্ব পরিচয় ছিল না। বৃটিশ কিংবা পাকিস্থানিদের দ্বারা নানান সময়ে শোষিত এই অঞ্চল কাগজে পত্রে বাংলাদেশ নামে কখনই পরিচিত ছিল না বরং এটিকে কখনো বলা হতো ভারতবর্ষের ইস্ট বেঙ্গল, কখনো বা ইস্ট পাকিস্থান।

ভিনদেশী বেনিয়াদের শোষন, নিপীড়ন আর পরাধানীতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে বাঙ্গালীর জাতিগত পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ তথা বাঙ্গালির জন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আখাঙ্খা এই অঞ্চলের মানুষের ছিল আজন্ম। তারা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতো হে আল্লাহ, আমাদেরকে এমন এক অমৃতের সন্তান দাও যে আমাদেরকে স্বাধীনতা এনে দিবে। এমনই এক অমৃতের সন্তান, বাঙ্গালীর  মুক্তির কাণ্ডারী হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন আজ থেকে শত বছর আগে, ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালাগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। যার হাত ধরেই বহু সংগ্রাম আর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী পেয়েছিল তাদের বহুল কাঙ্খিত স্বাধীনতা।

সেই স্বাধীনতার আজ পঞ্চাশ বছর। আর স্বাধীনতার স্থপতি, ইতিহাসের সেই মহান নায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ। যেটিকে সরকার মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার জন্য মুজিববর্ষ উদযাপন এবং স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী প্রত্যাশা অনুযায়ী করা না গেলেও মোটামুটিভাবে উদযাপন করা হয়েছে।

যে মানুষটি নিজের জীবন বাজি রেখে বাঙ্গালীর বহুল কাঙ্খিত স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন সেই মানুষটিকে তার নিজ গৃহে নিমর্মভাবে সপরিবারে হত্যা করার দিনটিকেও আমরা সার্বজনীনভাবে সকলে মিলে পালন করতে পারি না। জাতি হিসেবে এটা যে আমাদের জন্য কত বড় লজ্জার তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৫ আগস্টের শোকগাথা ভুলবার নয়, বাঙ্গালীর হৃদয়ে এই হত্যাকাণ্ডের রক্তক্ষরণ আজো চলমান। এটিকে কোনভাবেই নিছক কোন হত্যাকাণ্ড বলা যাবে না, এটি কেবলমাত্র কোন ব্যক্তি মানুষকে হত্যাও নয়। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সর্বোপরি একটি আদর্শকে হত্যা করার অপচেষ্টা হয়েছে যার মাধ্যমে দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি এবং সংস্কৃতিকে বাঙ্গালীর ঐতিহ্যের ধারা থেকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টাই কেবল হয়েছে।

একটি অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের এই দেশকে এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার চাদরে মোড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে যার ধারা এখনও চলমান। প্রায়শই এদের আস্ফালন দেখতে পাই।

মুজিব আদর্শে উদ্ভাসিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষগুলো বর্তমানে  ভুঁইফোড়, হাইব্রিড, সুবিধাবাদী এবং সুবিধাভোগী চেতনা ব্যবসীয়দের দাপটে অনেকটাই কোনঠাসা। এমন বাস্তবতায় প্রতি বছর যখন জাতীয় শোক দিবস আসে তখন কত ধরনের তথাকথিত নেতাদের পোস্টার যে দেখতে পাই বলে শেষ করা যাবে না। উল্লেখিত এসব পোস্টারে শোক দিবসের মর্মার্থ কিংবা ভাবার্থ কোনটার  প্রতিই কোন গুরুত্ব থাকে না বরং পোস্টার/ব্যানারকারীর দাত বের করা হাসিমাখা মুখ আর নিজের ছবিকে ফোকাস করতে গিয়ে শোক দিবস চাপা পড়ে যায় অবলীলায়।

এবার লক্ষ্য করলাম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-গুলো বন্ধ থাকার পরও নিজ নিজ নামে একই মডেলের শোক দিবসের ব্যানার টানানো হয়েছে। বিষয়টি আমার কাছে অন্তত ভাল লেগেছে। সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান যেহেতু একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ ছিলেন। তাঁর একটি রাজনৈতিক দল ছিল এবং আছে। সেক্ষেত্রে তাঁর দলের পক্ষ থেকে যদি রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ কিংবা বঙ্গবন্ধুপ্রেমী সাধারণ মানুষ যারা শোক দিবসের ব্যানার পোস্টার করতে চান তাদের জন্য একটি নির্ধারিত মডেল করে দেওয়া হয় এবং কারা এই পোস্টার করতে পারবেন এ ব্যাপারে যদি একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়, তবে দিবসটির ভাবার্থ ও মর্যাদা সমুন্নত থাকবে এবং জাতীয় শোক দিবসের মর্ম বাণী যথার্থভাবে উপস্থাপিত হবে।

অগ্রসরমান আমাদের এই জাতি রাষ্ট্রটির পঞ্চাশ বছরের মাইল ফলকে দাঁড়িয়ে এবং জাতির পিতার জন্মশতবর্ষের বিশেষ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে জাতীয় শোক দিবসে সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান রেখে বলতে চাই, প্রত্যেকেই যার যার রাজনীতি করুন, কোন সমস্যা নেই। কিন্তু সকল রাজনৈতিক মতপার্থক্যের উর্ধ্বে উঠে এবং ভিন্নমত-পথ ভুলে সবাই মিলে জাতীয় শোক দিবস পালন করি।

গাজী মহিবুর রহমান, কলাম লেখক

ই-মেল: gmrahman1980@gmail.com ফোন: 01716461941

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     সম্প্রতি প্রকাশিত আরো সংবাদ