আজ ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মাছের আড়তের সঙ্গে আমরাও শেষ হয়ে যাব

ভৈরব প্রতিনিধি.
কিশোরগঞ্জের ভৈরব নৈশ মৎস্য আড়তের যাত্রা ২৫ বছর আগে। মেঘনা নদীর মোহনার পুরনো ফেরিঘাটের পলতাকান্দা এলাকায় ১৯৮২ সালে প্রায় ৬ একর জমির ওপর ৩ শতাধিক আড়তদার (মালিক) নিয়ে প্রতিষ্ঠিত কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ঐতিহ্যবাহী নৈশ মৎস্য আড়তের বাজার। এক সময় এ বাজারটিতে ৩ শতাধিক আড়ত মালিক মাছ বেচা-কেনা করতেন। প্রতিদিন এ বাজারে কয়েক কোটি টাকার মাছ বেচা-কেনা হতো।

আড়তে বর্তমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৮৬টি। আড়তকে কেন্দ্র করে অন্তত ২০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত। এই আড়তের বিশেষত্ব বিস্তীর্ণ হাওরের মিঠাপানির মাছ। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ইটনা, নিকলী, হবিগঞ্জের লাখাই, সাল্লা, দিরাই, আজমিরীগঞ্জ, নেত্রকোনার হাওরের আহরিত মাছের বেশির ভাগ ট্রলারযোগে আড়তে এনে বাজারজাত করা হয়। আইড়, বোয়াল, বাইম, তারা বাইম, রুই, কাতলা, চিংড়ি, পাবদা, আলনি, মলা, ঢ্যালা, কাজলি, গুলশা, বাইলা, টেংরা, শোল, গজার, কালিবাউশ, শিং, কই, মাগুর, পুঁটি, বইছা, চান্দা, কাচকি মাছের জন্য বিশেষ সুনাম রয়েছে ভৈরবের এই আড়তের। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে রাত দুইটা পর্যন্ত কেনাবেচা হতো। হিসাবের খাতা গোটাতে গোটাতে ভোর হয়ে যেত। এই আড়তের ৮০ ভাগ মাছ ঢাকার বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ হয়ে থাকে। এ ছাড়া গাজীপুর ও চট্টগ্রামেও যায়। কিছু অংশ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব ও কাতার এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অঘোষিতভাবে দেশের সর্ববৃহৎ মাছের আড়তের খেতাব পাওয়া ভৈরব নৈশ মৎস্য আড়তে এখন মাছ ওঠা মাত্রাতিরিক্ত হারে কমে গেছে। নামে রাতের আড়ত হলেও মাছ না থাকায় এখন সন্ধ্যার মধ্যেই কেনাবেচা গুটিয়ে ঘরমুখো হতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

রাত ১০টার দিকে আড়তে গিয়ে দেখা গেছে, বাজার জুড়ে নীরবতা। নেই ক্রেতা-বিক্রেতার কোন ছায়া। আড়তের সব কটি ঘরের আলো নেভানো। আড়তজুড়ে অন্ধকার। ওই সময় ১৮৬টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে খোলা ছিল মাত্র চার থেকে পাঁচটি। সেগুলোতেও মাছের কোন বেচাকেনা ছিল না। ঘরে বসে ফুটবল খেলা দেখছিলেন কয়েকজন লোক।

ব্যবসায়ীরা জানালেন, ৪-৫ বছর আগে থেকে এই আড়তে মাছ আসা কমতে শুরু করে। বর্তমানে হাওরের মাছ নেই বললেই চলে। আড়তের দুরবস্থার কারণ জানতে গিয়ে জানা গেল, আহরিত মাছের বেশির ভাগ এখন বিকল্প পথে সরাসরি ঢাকায় সরবরাহ হচ্ছে। ভৈরব আড়ত থেকে হাওরের বিভিন্ন পয়েন্টের নদীপথে দূরত্ব গড়ে তিন ঘণ্টা হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। এছাড়া হাওরে পানি কম হওয়া, খাল-বিল ভরাট এবং খাল-বিলের সঙ্গে মেঘনার বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হওয়া, পোনা ও মা মাছ নিধনে সরকারি বাধা না থাকা, মেঘনায় পোনা অবমুক্ত না করার এসব কারণে হাওরে মাছ কমে যাচ্ছে। আর মেঘনায় নৌ-পুলিশের টহল সন্ধ্যার পর গুটিয়ে নেওয়ায় রাতে ডাকাতের উৎপাতও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া এ বছর বর্ষার মৌসুমেও এখনো কোন পানির দেখা নাই। অনেকে বলেন গাঙে পানি নাই। ভরা বর্ষায়ও গাঙ ভরে না। খাল-বিল তো নাই-ই। মাছ কি আর জমিতে হইব?’ তাছাড়া বর্তমানে বৈশ্বিক করোনা মহামারির কারণে সরকার ঘোষিত লকডাউনের প্রভাবতো আছেই।

জান্নাত এন্টার প্রাইজের হানিফ মিয়া ডালায় করে মাছ বিক্রি করেন প্রায় এক যুগ। তাঁর ডালায় ছিল ১০ থেকে ১২ কেজি ওজনের বোয়াল রুই, এবং ৭ কেজি ওজনের কাতলা মাছসহ আইড় কাটা মাছ, ছিল পাবদা, গুলশা ও চিংড়ি মাছ। এই মাছগুলো এসেছে হাওর থেকে। তিন থেকে চার ঘণ্টা নদীপথ পাড়ি দিয়ে ভালো দামের আশায় এই আড়তে আনা হলেও প্রত্যাশিত দাম উঠছিল না। দাম না ওঠার কারণ জানতে চাইলে হনিফ বলেন, আগেতো টুকটাক বেচা-কেনা হতো, কিন্তু এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে গাড়িওয়ালা লোক আসা বন্ধ। ফলে দাম দিয়া কেনার লোকও নেই। আর বেচাকেনা না হওয়ার একমাত্র কারণ বর্তমানের মহামারি করোনা।

আশুগঞ্জ থেকে আসা এক মাছ ব্যবসায়ী জানায়, আমি প্রতিদিন আড়তে আসি মাছ নিতে কিন্তু মাছ তেমন না আসায় আর নিতে পারি না । যা কিছু মাছ অত্র এলাকার জেলেরা নিয়ে আসে তাও আবার পাইকাররা নিয়ে কাড়াকাড়ি।

মাছ ব্যবসার সাথে অঙ্গ অঙ্গভাবে জড়িত থাকে আরেক ব্যবসা বরফ ফ্যাক্টরি, কিন্তু এখানেও মাছ না থাকার কারণে তাদের আর ব্যবসা হচ্ছে না।

বরফ ফ্যাক্টরির এক মালিক জানায়,আগে ভৈরবে বরফের ফ্যাক্টরি ছিল ৩০-৩৫টি আর এখন মাত্র হাতে গোনা ২-৩টি । কারণ হিসেবে তিনি জানায় আমাদের ব্যবসা মূলত মাছের সাথে। মাছ যত বেশি আসব ততই আমাদের বরফের চাহিদা থাকবে। কিন্তু এখন আর মাছও নাই আমাদের বরফের ব্যবসাও নাই।

ভৈরব মৎস্য আড়ত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন জানায়, এক সময় মাছের জন্য কেউ হাটতে পারত না। গত কয়েক বছর আগেও আমরা ভাল মাছ পাইছি। কিন্তু এখন আর আগের মত মাছ আসে না।

কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন হাওড়ে পানি কম আসে,আর সেখান থেকে ঢাকার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হইছে। এছাড়া তারা আমাদের চেয়ে ঢাকায় ভাল দাম পাই, আর এ বছরতো যা মাছ আসতো তাও লকডাউনের কারণে আর তেমন আসেনা আর আসলেও ক্রেতার অভাবে মাছের বেচা কেনা হয়না।

তিনি আরও বলেন, আমরাতো লাখ লাখ টাকা দাদন দিয়েও এখন আর মাছের দেখা পাচ্ছি না। মাছের আড়তের সঙ্গে আমরাও শেষ হয়ে যাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     সম্প্রতি প্রকাশিত আরো সংবাদ