আজ ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সরকারের মহতি উদ্যোগ বিফলে! কিশোরগঞ্জে করোনায় ক্ষতিগ্রস্থ অসহায় শিল্পীদের প্রণোদনা স্বচ্ছলদের মধ্যে লুটপাট

বিশেষ প্রতিনিধি. কিশোরগঞ্জ.    কিশোরগঞ্জে করোনায় অসহায় ও কর্মহারা ৫০জন শিল্পী কলা কুশলীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের সহায়তা ৫লাখ টাকার বিতরণ তালিকায় ব্যাপক দূর্ণীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। গত ২৬ এপ্রিল থেকে বিতরণ করা ওই শিল্পীর তালিকা জেলা শিল্পকলা একাডেমীর কালচারাল অফিসার, কতিপয় অসাধু শিল্পীদের যোগসাযোশে গোপনে তৈরী করা হয়েছে। তালিকায় বিত্তবান, সরকারী চাকুরিজীবি, মাদ্রাসা-কলেজের শিক্ষকের নাম রয়েছে। তালিকায় নেই কোন কবি সাহিত্যিকদের নাম। এছাড়াও একই পরিবারের ২জনের নাম যারা কেউই দুঃস্থ নন, আত্নীকরণের মাধ্যমে এ প্রণোদনা পেয়েছে। গোপনে এমন কারচুপি তালিকা করার প্রতিবাদে জেলা জুড়ে শিল্পী সমাজে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের সহায়তায় জেলায় করোনায় অসহায় ও কর্মহীন ৫০জন শিল্পী কলা কুশলীকে জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে গত ২৬ এপ্রিল থেকে চেকের মাধ্যমে প্রনোদনা দেয়া শুরু করে। এদের মধ্যে কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক, সরকারী চাকুরিজীবি ও মাদ্রাসা-কলেজের শিক্ষক রয়েছেন। এর ফলে অনেক প্রকৃত অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্থ শিল্পী সহায়তা না পেলেও শিল্পীদের চেকবিতরণ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এতে সরকারের এ মহতি উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জেলার শিল্পী সমাজের মধ্যে। এ নিয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শিল্পী সমাজের বিভিন্ন সাংস্কৃতি সংগঠনের নেতাকর্মী ও বঞ্চিতরা একাধিকবার শিল্পকলায় তার প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। তারা  বলেন, প্রশাসনের কাছে কি তারাই শুধু শিল্পী ? তারা ওখানে দালালি করে নিজেরা নিজেকে শিল্পী হিসেবে জাহির করে। এ ছাড়া অন্য কাউকে শিল্পী বলে গণ্যও করে না।

 ছবিতে সরকারী ত্রাণ তহবিলের প্রণোদনা প্রাপ্ত ৩ জন বিত্তবান শ্রেণীর শিল্পী

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আসা তালিকা সূত্র অনুযায়ী দেখা যায়, তালিকায় সিরিয়ালে ১নং নিত্যশিল্পী বাবু নারায়ণ কুমার দে এর নাম রয়েছে।  সিরিয়ালের প্রথমেই কোটি টাকার সম্পত্তির মালিকের নাম দেখে অনেকেই অবাক হয়েছেন। তিনিও ১০হাজার টাকা চেক নিয়েছেন। তালিকার ৩৩নং সিরিয়ালে কনক কান্তি বিশ্বাস ও ৩৭ নং সিরিয়ালে তার সহোদর বড় ভাই কুশল কিশোর বিশ্বাসের নাম রয়েছে। কনক একজন প্রতিষ্ঠিত সাউন্ড ব্যবসায়ী। তার শহরের প্রাণ কেন্দ্র গৌরাঙ্গ বাজারে মোড়ে সাউন্ডের দোকান ও গোডাউন রয়েছে। এছাড়া শহরের কালীবাড়ি ও থানা মার্কেটে পজিশনে নিজের কেনা দুটি দোকানের মালিক। একটিতে এসিসহ তার সাউন্ডপ্রোভ চেম্বার। অন্যদিকে তার স্ত্রী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক। শহরের রাখুয়াল এলাকায় নিজেস্ব বাসাবাড়ি রয়েছে। সে ও তার সহোদর ভাই কুশল কুমার বিশ্বাস (একই ঘরে) দুইজনে ২০ হাজার টাকার চেক নিয়েছে। তালিকার ৯ নং সৈয়দ নূরুল আউয়াল (তারা মিয়া) তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা। তিনি মোঠা অংকের পেনশনের টাকাও পেয়ে যাচ্ছেন। শহরের জনতা স্কুল রোড তার নিজস্ব ৫তলা বাড়ি রয়েছে। যার মূল্য কোটি টাকার উপরে হবে। তালিকায় ২নং প্রনয় কুমার তিনি একটি আলীম মাদ্রাসার শিক্ষক এবং জেলা শিল্পকলার সংগীত শিক্ষক। তালিকায় ৫নং মানস কর ও ৬ নং তার ভাই বৌ-উর্মিলা রক্ষিত  বলে  জানা গেছে। তালিকায়  তাদের  নাম রয়েছে। তালিকায় ১৪ নং শাইমনুরে আলম সাফাতকে অভিনয় শিল্পী দেখানো হয়েছে। আসলে তিনি অনেক আগেই অভিনয় ছেড়ে শীপ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকুরী করছেন। তিনি এলাকায়ই থাকেনও না  বলে একটিি  সূত্র জানায় । তালিকায় ৮নং কাজী আহম্মেদ রাজু যার বাড়ি অন্য জেলায়। তালিকায় ৪৫ নং সুব্রত চন্দ্র (টুনটুন) প্রতিবারই সে যে কোন অনুদান পায়।  বর্তমানে সে একজন স্বচ্ছল ব্যাক্তি।

 নিচের ছবিতে  সরকারী ত্রাণ তহবিলের প্রণোদনা প্রাপ্ত ৪জন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিল্পী

তালিকায় ৪৭ নং এ কে এম জসিম উদ্দিন হিরু তিনি দুটি কলেজে সংগীতের শিক্ষক এবং স্বচ্ছল। তালিকায় ৩৯নং মাসুদুর রহমান আকিল তিনি একটি মেডিকেল কলেজ ও একটি ক্লিনিকে চাকুরি করেন। তালিকায় ৩১ নং পিনাকী ঘোষ মিষ্টি সে মধ্যবিত্ত স্বচ্ছল পরিবারের নৃত্যশিল্পী। তাদের শহরের বত্রিশ এলাকায় নিজস্ব বাসাবাড়ি রয়েছে। তালিকায় ৭নং আব্দুর রাশিদ কাজল তিনি জেলা শিল্পকলায় চাকুরি করেন। এছাড়াও তালিকায় ২০ নং মজিবুর রহমান, ২৮ মো. আব্দুর রহমার ভূয়া (বাবুল), ৩৪ নং চমন দাস, ৪৯ নং চন্দন দেবনাথ, ৩৭ নং হোসনে আরা মমতাজ, ২২ নং বিনয় কর, ১০ নং শুভ্র বণিক প্রাপ্ত, ১১ নং অন্তরা মজুমদার, ১৮ নং মো. মোস্তফা আহম্মেদসহ আরও অনেকেই পেয়েছেন যারা সকলেই স্বচ্ছল। কিন্তু তাদের থেকেও অধিক অসহায় ও কর্মহারা যারা, দিনে আনে দিনে খায়,  যেমন কাঠ মেস্তুরি কন্ঠশিল্পী শংকর, কবি শোভাষ চন্দ্র, কন্ঠশিল্পী স্মৃতি দে, বাউল সাত্তার, গীতিকার আজিমুদ্দিন, কবি রাশেদ মনির রয়েছেন। এছাড়াও কর্মহারা  বেতার ও টেলিভিশন কন্ঠশিল্পী কায়েস আকন্দ, ফোক শিল্পী সেতেরা বেগম সেতুসহ অনেকেই এ তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

নিচের ছবিতে  সরকারী ত্রাণ তহবিলের প্রণোদনা প্রাপ্ত ৪জন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিল্পী

অভিযোগ রয়েছে, সরকারিভাবে যখন করোনায় ক্ষতিগ্রস্থ শিল্পীদের সহায়তা দেয়ার জন্য নামের তালিকা আহবান করা হয়, তখন তা শিল্পী মহলে প্রকাশ না করে গোপনে শিল্পকলা একাডেমীর কালচারাল অফিসার তমাল ভোস ও শহরের দুুই/একটি সংগঠনের শিল্পীদের একটি অসাধুচক্র বসে এমন তালিকা প্রেরণ করে। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রকৃত শিল্পীদের বিষয়টি জানতেই দেয়নি তারা। অথবা তাদের আবেদন অগ্রাহ্য করা হয়েছে। যার ফলে প্রকৃত অসহায় ও কর্মহারা শিল্পীরা অনেকেই বঞ্চিত হলেও মুখচেনা বিভিন্ন ব্যক্তির নাম দিয়ে তালিকা প্রেরণ করা হয়। চূড়ান্ত তালিকার প্রায় ৭০ ভাগই গত বছরও করোনার প্রণোদনা পেয়েছেন এবং তালিকায় ৬০ভাগই স্বজনপ্রীতি, চাকুরিজীবি ও স্বচ্ছল বলে দাবী করেছেন একাধিক সংস্কৃতি সংগঠক। ফলে সরকারের এত বড় একটি মহতি উদ্যোগ ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। এক সপ্তাহ ধরে এ নিয়ে জেলাজুড়ে চলছে তোলপাড়। চলছে পেসবুকে প্রতিবাদের নিন্দার ঝড়।
জেলার সুনামধন্য জনপ্রিয় সাংস্কৃতি সংগঠন তোলপাড় শিল্পী গোষ্ঠি এর সভাপতি মো. বদরুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক এস আই পলাশ ক্ষোভ ও দুঃখের সঙ্গে জানান, প্রকৃত শিল্পীরা যেখানে করোনার কারণে চরম অর্থ সংকটে অনেকে অনাহারে অর্ধাহারে আছেন। পরিচিত অনেক প্রয়াত শিল্পীদের পরিবার যেখানে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সেখানে শিল্পীদের জন্য দেয়া সরকারের এত বড় একটি মহতি উদ্যোগের টাকা নয়ছয় করা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তা জেলা প্রশাসনের একটি সুষ্ঠু তদন্তের দরকার বলে মনে করি। তারা বার বার একই কৌশলে অসহায় শিল্পীদের সরকারী সুবিধা গোপনে এ ভাবে তালিকার মাধ্যমে আত্নসাৎ করে আসছেন।

নিচের ছবিতে শিল্পী সমাজের ভিবিন্ন সাংস্কৃতির সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতিবাদ

প্রতিধ্বনি থিয়েটার এর সাবেক সভাপতি ও কিশোরগঞ্জ থিয়েটার ফোরাম এর সাধারণ সম্পাদক আবু জাবিদ সোহেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা নিজেরা অর্থলোভে গোপনে শিল্পীদের তালিকা করে প্রণোদনা নিয়েছে তারা ইচ্ছে করলে দুই/তিনশত  শিল্পীর নাম দিতে পারতো। তাহলে আর এমন সমস্যার সৃস্টি হতো না। অসাধু মন-মানসিকতা নিয়ে যারা  তালিকায় কারচুপি করেছে। তাদেরকে আমি নিন্দা ও ধিক্কার জানাই। তারা শিল্পী নামে কলঙ্ক।
শিল্পকলা প্রতিবাদ সভায় মানবাধিকার নাট্য পরিষদ এর সভাপতি হারুন আল রশিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রধান মন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল হতে অসহায়, কর্মহারা এবং কবি সাহিত্যিকদের জন্য আসা প্রণোদনার টাকা একটি চক্র এমন ভূতুরের তালিকা তৈরি করে নিয়ে যাবে ভাবতেও পারিনা। শিল্পীদের মন-মানসিকতা এমন থাকা উচিত নয়। আমি তার তীব্র নিন্দা জানাই।
সাধারণ সম্পাদক শিখর নাট্য সম্প্রদায় জিয়াউল হক সোহাগ নিন্দার ভাষায় জানায়, যারা এমন নেক্কারজনক কাজটি করেছে তারা শিল্পী সমাজের নিন্দিত ব্যক্তি। আমরা তার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই।

  নিচের ছবিতে সরকারী ত্রাণ তহবিলের প্রণোদনা প্রাপ্ত ৪জন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিল্পী

জনপ্রিয় জলছবি সাংস্কৃতি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান কায়েস ও কন্ঠশিল্পী কায়েস আকন্দসহ আরও কয়েকজন ক্ষোভে বলেন, জেলা শিল্পকলা একাডেমীর আড়ালে একটি অসাধু চক্র যেভাবে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করেছেন তাতে আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। এরা শিল্প সংস্কৃতির চরম শত্রু। তারা অসহায়দের টাকা লুটেপুটে খাচ্ছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সদস্য সচিব ও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের মিয়া বলেন, এ তালিকা করার জন্য শিল্পকলার কর্মকর্তারা কোন দ্বায়ীত্ব পায় নাই এবং আমরা কোন তালিকাও দেইনি। কে বা কাহারা শিল্পিদের তালিকা দিয়েছে তা আমার জানা নেই।
জেলা কালচারাল অফিসার তমাল ভোস তার দোষ অস্বীকার করে  জানান, শিল্পীদের তালিকার সর্ম্পকে আমার জানা নেই। করোনাকালীন এমন পরিস্থিতিতে অসহায় শিল্পীদের প্রতি সকলেই সহযোগিতা করা দরকার ছিল। মন্ত্রনালয় থেকে যদি কোন অনুদান আমার মাধ্যমে আসে। তবে অসহায় সকল শিল্পীরাই যেন পায় সেই চেষ্টা থাকবে।
জেলা প্রশাসক ও জেলা শিল্পকলার সভাপতি মোহাম্মদ শামীম আলম জানান, কে বা কাহারা এ তালিকা করেছেন আমার জানা নেই। তালিকা নিয়ে সাংস্কৃতি সমাজের নেতাকর্মীরা বঞ্চিতদের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে কিছু সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাহলে আর কোন ক্ষোভ থাকবে না মনে করি। আর তালিকাটি খতিয়ে দেখে অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে দাবী তুলেছেন কিশোরগঞ্জ জেলার সংস্কৃতি অঙ্গনের শিল্পী ও কলাকুশলীরা।         প্লিজ নিউজটি শেয়ার করুন

শিল্পী সমাজের অনুরোধে জেলায় করোনায় অসহায় ও কর্মহীন ৫০জন শিল্পী কলা কুশলীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের সহায়তা সর্বমোট ৫০ জন যারা প্রণোদনা পেয়েছে নিন্মে তালিকা পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ করা হলো।   তালিকা দেখতে এখানে ক্লিক করুন  Artist List

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     সম্প্রতি প্রকাশিত আরো সংবাদ