আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মহাপরিকল্পনার মধ্যেই আটকা ভাষা জাদুঘর

Spread the love

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি পাঠাগারসহ ভাষা জাদুঘর নির্মাণে উচ্চ আদালত আদেশ দিয়েছেন ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মসহ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে এই জাদুঘর স্থাপনের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া সেই আদেশ আজও বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের ‘মহাপরিকল্পনার’ মধ্যেই আটকে আছে ভাষা জাদুঘর নির্মাণের উদ্যোগ। সর্বশেষ প্রায় চার বছর আগে হাইকোর্টে দাখিল করা এক প্রতিবেদনে এমনটিই বলা হয়েছে। এর পর আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

জানতে চাইলে রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী বিবাদীপক্ষ ২০১৭ সালে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করে। তাতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও শহীদ মিনার এলাকায় সরকার সাংস্কৃতিক অঞ্চল স্থাপন করবে। এ জন্য একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার মধ্যে ভাষা জাদুঘর নির্মাণের বিষয়টি রয়েছে। ওই অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের পর আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তিনি আরও বলেন, সাংস্কৃতিক অঞ্চলের সঙ্গে ভাষা জাদুঘর স্থাপনের কোনো সম্পর্ক নেই। এভাবে দীর্ঘদিনেও রায় বাস্তবায়ন না করে ফেলে রেখে বিবাদীরা আদালত অবমাননা করে যাচ্ছেন। আমরা আবারও আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করব।

২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা এবং ভাষা জাদুঘর স্থাপনের নির্দেশনা চেয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে রিট করে। ওই রিটের চূড়ান্ত শুনানি করে ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে শহীদ মিনারের পাশে গ্রন্থাগারসহ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা এবং জাদুঘরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস-সমৃদ্ধ তথ্যপঞ্জিকা রাখা, ভাষাসংগ্রামীদের প্রকৃত তালিকা তৈরি ও প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ ও মর্যাদা রক্ষাসহ আটটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে গত ১০ বছরে কয়েক দফা সময় নিয়েও ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেনি কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে অগ্রগতি জানার জন্য রিটের বিবাদী গণপূর্ত সচিবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সেই আট নির্দেশনা

১. কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্ধারিত এলাকায় সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করে ওই এলাকায় কোনো ভবঘুরে যাতে ঘোরাফেরা করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। অসামাজিক কার্যকলাপ যাতে চলতে না পারে, সে জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

২. শহীদ মিনারের মূল বেদীতে কোনো ধরনের মিটিং, মিছিল, পদচারণা, আমরণ অনশন করা থেকে বিরত রাখতে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে মূল বেদীতে ফেব্রুয়ারি মাসে সাংস্কৃতিক কর্মকা- চলতে এবং ভাষাসৈনিকসহ জাতীয় ব্যক্তিত্বদের মরদেহে সর্বস্তরের জনগণের সম্মান প্রদর্শনের জন্য শহীদ মিনারের মূল বেদী ব্যবহার বা বিশেষ দিনে ফুল দিতে কোনো বাধা থাকবে না। মূল বেদীর পাদদেশে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাতেও কোনো নিষেধ থাকবে না। শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় কমপক্ষে তিনজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেবে পূর্ত মন্ত্রণালয়। আর ঢাকা সিটি করপোরেশন তিনজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেবে।

৩. ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সবাইকে মরণোত্তর জাতীয় পদক এবং জীবিতদের জাতীয় পদক দেওয়ার ব্যবস্থা নেবে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ভাষা শহীদদের ছবিসংবলিত সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করে বোর্ড বা ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবে। ৪. ভাষাসৈনিকদের মধ্যে জীবিত কেউ যদি সরকারের কাছে আবেদন করেন, তা হলে তাদের যথাযথ আর্থিক সাহায্য এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। ৫. সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ভাষাসৈনিকদের প্রকৃত তালিকা তৈরির জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি এবং জেলায় জেলায় ডিসিদের মাধ্যমে কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করবেন। কমিটির সদস্য হবেন ভাষাসৈনিক, কবি, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ ও মুক্তিযোদ্ধারা। ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে।

৬. কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি লাইব্রেরিসহ ভাষা জাদুঘর নির্মাণ করতে হবে। সেখানে সার্বক্ষণিক গাইড থাকবে। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে প্রকৃত ইতিহাস (সংক্ষিপ্ত তথ্যাবলি) সন্নিবেশিত করে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ব্রুশিয়ার তৈরি করে জাদুঘরে রাখতে হবে, যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারেন। পূর্ত মন্ত্রণালয়কে ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে জাদুঘরের নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে।

৭. জীবিত ভাষাসৈনিকদের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করতে হবে এবং সরকারের সাধ্যমতো সব রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা তাদের দিতে হবে।

৮. বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ ও সংরক্ষণ করতে হবে।

এই নির্দেশনাগুলোর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয়, সপ্তম ও অষ্টম দফা নির্দেশনার প্রায় পুরোটাই বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকি নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় তৎকালীন সংস্কৃতি ও পূর্ত সচিবের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করে এইচআরপিবি। ওই মামলায় সংস্কৃতি ও পূর্ত সচিবকে তলব করেছিলেন হাইকোর্ট। পরে ওই বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি তারা আদালতে হাজির হয়ে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দেন। তখন আদালত তাদের ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে গ্রন্থাগারসহ ভাষা জাদুঘর স্থাপন এবং ভাষা সংগ্রামীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নসহ রায় বাস্তবায়নে নির্দেশ দেন। কিন্তু এরপরও ওই রায়ের পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।

এ অবস্থায় ২০১৭ সালে রিটকারীপক্ষ হাইকোর্টে একটি সম্পূরক আবেদন দাখিল করেন। এই আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট ভাষা জাদুঘর স্থাপনের রায় বাস্তবায়নে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে- তা জানতে চান। বিবাদীপক্ষকে ছয় মাসের মধ্যে হলফনামা আকারে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। জাদুঘর নির্মাণের পাশাপাশি সেখানে সার্বক্ষণিক গাইড নিয়োগ, ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস সন্নিবেশন করে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ব্রুশিয়ার তৈরির বিষয়ে পদক্ষেপের কথাও ওই প্রতিবেদনে জানাতে বলা হয়। এর পর বিবাদীপক্ষ ‘মহাপরিকল্পনার’ কথা তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন দাখিল করলেও এর পর আর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     সম্প্রতি প্রকাশিত আরো সংবাদ