আজ ৫ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

পদ্মার দুই পাড় মিলনের অপেক্ষায়

তোলপাড় ডেস্ক:

স্বপ্নের পদ্মা সেতু হবে তো এমন প্রশ্ন করা বন্ধ হয় ২০১৭ সালেই। ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে অবয়ব পেতে শুরু করে পদ্মা সেতু। এখন প্রশ্ন, কবে শেষ হবে সেতুর কাজ। হ্যাঁ, সেতুর কাজও এগিয়ে চলছে। ছয় দিনের মাথায় শেষ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে পুরোপুরি দৃশ্যমান হবে পদ্মা সেতু। গতকাল বসানো হয় ৩৯তম স্প্যান। বিজয় দিবসের আগেই সবকটি তথা ৪১টি স্প্যান বসানো সম্পন্ন করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিজয় দিবসের আগেই পদ্মা সেতুর সবকটি স্প্যান বসানো শেষ হবে। কাক্সিক্ষত সময়ের মধ্যেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে পদ্মা সেতু। গতকাল সকাল ১০টা ৫৮ মিনিট পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষের জন্য আনন্দদায়ক মুহূর্ত ছিল। এর আগে প্রতিকূল আবহাওয়া বা নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে স্প্যান বসানো যায় না। এবার প্রকৃতি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বাংলাদেশের লাল সবুজের ভূখ- থেকে মানুষ যেন পদ্মার বুক চিড়ে এপার-ওপার যেতে পারে সেই প্রত্যাশা করছে খরস্রোতা নদীটিও। তাই সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে স্প্যান বসানোর কার্যক্রম শুরু হলে ১০টা ৫৮ মিনিটে স্প্যানটি সফলভাবে বসানো হয়।

দিন-রাত পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়ে চলা দেখে খুশি স্থানীয় জেলে, দোকানি। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের তো আনন্দের সীমা নেই। করোনা ভাইরাসের কারণে সেতুর কাজে অসুবিধা হচ্ছে কি? সেখানে কর্মরত আরিফ নামের এক কর্মী বলেন, কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। সেতুর ওপরের অংশ এবং নিচে রেল সেতুর কাজও চলছে। করোনা ভাইরাসের কারণে কাজের আপাতত সমস্যা হচ্ছে না। প্রকল্প এলাকায় কর্মরতরা কোভিডের সতর্কতার অংশ হিসেবে বাইরে যান না। নিজের দেশে এত্ত বড় একটা সেতু হবে এমন আনন্দে তাদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক।

মাওয়া প্রান্ত থেকে স্পিডবোটে করে জাজিরা প্রান্তে যাওয়ার পথে দেখা গেল- নদী পাড়ি দেওয়া বিভিন্ন যাত্রী খুশিমনে তাকিয়ে আছে পদ্মা সেতুর কর্মযজ্ঞের দিকে। তৃপ্তির ঢেঁকুর দিচ্ছেন ট্রলারে চড়া মানুষগুলো। কেউ কেউ পদ্মা সেতুর দিকে ইশারা করছেন। হয়তো বলছেন, আর কদিন পরই এ সেতু দিয়ে পার হবেন তারা।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, সেতুর কাজ এগিয়ে চলছে। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৮২ শতাংশ। নদীশাসন কাজের গতি কম। করোনার কারণে কিছুটা পিছিয়ে গেছে।

জানা গেছে, মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতুর কাঠামো। সেতুর ওপরের অংশে যানবাহন ও নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রয়োজন হবে ২ হাজার ৯৫৯টি রোডওয়ে স্ল্যাব। এর মধ্যে ৩০ নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী ১ হাজার ২৩৯টি রোড স্ল্যাব বসানো হয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো হবে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত বসানো হয়েছে ১ হাজার ৮৬০টি। পদ্মা সেতুর ওপরে উঠে দেখা যায় সেখানে স্ল্যাব বসানোর কাজ চলছে। একেকটি স্ল্যাবের সঙ্গে আরেকটি স্ল্যাব বিশেষ আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো হচ্ছে। রাস্তার মাঝখানে বসানো হচ্ছে ডিভাইডার। যদিও এগুলো প্রাথমিক ধাপ, তদুপরি ওপরের দিকে তাকালে মনে হয় সেতুর ওপরে আরেকটি মহাসড়ক। পদ্মা সেতুর পিলার থাকবে ৪২টি। এ পিলারগুলোর ওপর বসানো হচ্ছে ৪১টি স্প্যান। এর প্রকল্প ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালে। কয়েক দফা পেছানোর পর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী তথা ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধনের কথা বলা হচ্ছে। তবে সেদিন উদ্বোধন নিয়েও খানিকটা অনিশ্চয়তা আছে। কারণ ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এখনো সময় বৃদ্ধির ব্যাপারে অনুমোদন বা আপত্তি জানায়নি সেতু কর্তৃপক্ষ। এ পর্যন্ত তিন দফা বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারকে। পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। চার বছরের মধ্যে তা শেষ করার কথা ছিল। সর্বশেষ হিসাবে ২০২১ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যদিও বাস্তবে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাজেট প্রাক্কলন করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। করোনা ও বন্যার কারণে কাজের ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের।

এদিকে একই দিনে ট্রেন চালু করতে হলে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের অগ্রগতি দরকার। রেলওয়ের অধীনে পরিচালিত এ প্রকল্পের বর্তমান বাধা ডিজাইন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের জাজিরা সংযোগ সড়কের টোল প্লাজাসংলগ্ন সাউথবাউন্ড পাকা সড়কটি কেটে সেখানে পিয়ার স্থাপনের চেষ্টা করে সিআরইসি নামের ঠিকাদার। রেল সংযোগ প্রকল্পের নিযুক্ত ঠিকাদারের এ কর্মকা-ে সড়কের এলাইনমেন্ট এবং স্ট্যান্ডার্ড বিচ্ছিন্ন হয়েছে বলে দাবি পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষের। তাই এ স্থানে ভার্টিক্যাল ও হরাইজনটাল ক্লিয়ারেন্সসহ মাওয়া প্রান্তের ক্রসিং পয়েন্টের ডিজাইন নতুনভাবে করতে চিঠি দেয় তারা। সেতুর দুই প্রান্তে রেল প্রকল্পের জাজিরা অংশে ভায়াডাক্ট-২-এর পিয়ার নং পিএন-১৪ ও ১৫ এবং মাওয়া প্রান্তের ভায়াডাক্ট-৩-এর পিএস ২৫-১ ও ২৫-২ এলাকায় উঁচু এবং প্রস্থ ‘সঠিক’ না হওয়ায় রেলের ওই অংশের চলমান কাজ বন্ধ করে দেয় সেতু কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, সেতুর দুই প্রান্ত থেকে ভার্টিক্যাল ৫.৭ মিটার এবং হরিজেন্টাল ক্লিয়ারেন্স ১৫.৫ মিটার নিশ্চিত করতে হবে। কাজ বন্ধ হওয়ার আগে ভার্টিক্যাল ৫.৫ এবং হরিজেন্টাল ১১ মিটারের কিছু বেশি নিয়ে কাজ করছিল রেল। এ নিয়ে দফায় দফায় চিঠি ও নকশা বদলের পর রেল সিদ্ধান্ত নেয়, সেতু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা কাজ করবে। এ নিয়ে গত ২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক হয়। সেখানেই ডিজাইনজট সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছানো গেছে। এ সিদ্ধান্ত মানতে হলে মাত্র একটি অসম্পূর্ণ পিয়ার ভাঙতে হবে। অন্যগুলো এখনো তৈরি হয়নি। তবে এটি করতে গেলে ঠিকাদারের আপত্তি আছে কিনা, নতুন ডিজাইনে তাদের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ এবং সময় বৃদ্ধির অজুহাত দাঁড়ায় কিনা সে জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রেলসংযোগ প্রকল্পের র‌্যাম্পের সমস্যা মিটে গেছে। একই দিনে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলবে মাওয়া থেকে ভাঙা পর্যন্ত। সে অনুপাতে কাজ চলছে।

রেল সূত্রমতে, পদ্মা সেতুতে একই দিনে ট্রেন চালানো কঠিন। কারণ সেতু কর্তৃপক্ষ রেলকে সেতুর অংশে কাজের সুযোগ দেবে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। তা ছাড়া পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালে আর পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ৩ জুলাই থেকে। তার আগে ঋণচুক্তি হয় ওই বছরের ২৭ এপ্রিল। প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৩১ শতাংশ। বহুল কাক্সিক্ষত পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। মাওয়া থেকে ভাঙা পর্যন্ত নির্মাণ হলে পদ্মা সেতুর সড়কপথ চালুর দিনেই ভাঙা থেকে পাচুড়িয়া রাজবাড়ী সেকশনের মাধ্যমে রেল নেটওয়ার্ক চালুর টার্গেট আছে। পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ধরা হয় ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। পরে আরও ১১৯৪ কোটি টাকা পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     সম্প্রতি প্রকাশিত আরো সংবাদ