আজ ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

আপন ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্যবসা করেছেন তৈমূর আলম খন্দকার

তোলপাড় ডেস্কঃ

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলে নারায়ণগঞ্জে খুন হওয়া আলোচিত ব্যবসায়ী নেতা সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলা নিয়ে ব্যবসা করেছেন মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার।
আলোচিত এ হত্যাকান্ডের দাখিলকৃত চার্জশিটের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ছয় বছর টানা নারাজি দিয়ে অবশেষে নারাজি পিটিশনের আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বাদী তৈমূর আলম খন্দকার।

নিহতের পরিবার থেকে অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে এ মামলা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারাজি পিটিশন প্রত্যাহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল মামলার প্রধান আসামি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিনকে বাঁচিয়ে দেওয়া।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৈমূরের পক্ষে গিয়াস উদ্দিন সর্বাত্মক কাজ করবেন- এমন শর্ত সাপেক্ষেই তৈমূর নারাজি পিটিশন প্রত্যাহার করে নেন।
এ ছাড়া অন্তরালে রয়েছে নির্বাচনে কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার কানাঘুষা।

অথচ হত্যাকান্ডের পর থেকে তৈমূর ও তার পরিবার অভিযোগ করে আসছিলেন, গিয়াস উদ্দিনই সাব্বির আলম হত্যাকান্ডের মূল নায়ক। মামলার বর্তমান অবস্থা জানতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে রাজনৈতিকভাবে গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে চরম বিরোধিতায় থাকা তৈমূর আলম খন্দকারের এ গুপ্ত সমঝোতার খবর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিহত সাব্বির আলম খন্দকার ছিলেন দেশের গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ও সাবেক সহসভাপতি। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জেলা সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকারের ছোট ভাই। ২০০৩ সালের শুরুর দিকে অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাকালে একটি অনুষ্ঠানে প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতিতে সাব্বির আলম নিজের জানাজায় সবাইকে শরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন।

এর কয়েক দিন পর ১৮ ফেব্রুয়ারি শহরের মাসদাইরে নিজ বাড়ির অদূরে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন তিনি। ওই দিনই তার বড় ভাই তৈমূর আলম বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনের তৎকালীন বিএনপিদলীয় এমপি গিয়াস উদ্দিন, তার শ্যালক জুয়েল, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খান, তার ভাই জিকু খান ও মামুন খান, শাহিন ওরফে বন্দুুক শাহিন, রায়হান, মনির, এরশাদ, মনিরুল ইসলাম সজল, অহিদুল ইসলাম ছক্কু, সাঈদুর রহমান, সাঈদ হোসেন রিপন, রিয়াজুল ইসলাম, হালিম, টুক্কু মিয়া, কাওসার, মামুন, নাদিম হোসেন, মঙ্গল ওরফে লিটন, মোক্তার হোসেন, মনিরুজ্জামান শাহিন, নাজির, আবদুল আজিজকে আসামি করে ফতুল্লা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার পর মোট নয়জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। পরে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-তে স্থানান্তর করা হয়। সিআইডির এএসপি মসিহউদ্দিন দশম তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘ প্রায় ৩৪ মাস তদন্ত শেষে ২০০৬ সালের ৮ জানুয়ারি আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে মামলা থেকে গিয়াস উদ্দিন, তার শ্যালক জুয়েল, শাহিনকে অব্যাহতি দিয়ে সাবেক ছাত্রদল সভাপতি জাকির খান, তার দুই ভাই জিকু খান, মামুন খানসহ মোট আটজনকে আসামি করা হয়। প্রধান আসামি গিয়াস উদ্দিনকে মামলা থেকে বাদ দেওয়ায় বাদী তৈমূর আলম খন্দকার সিআইডির দেওয়া চার্জশিটের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি আদালতে নারাজি পিটিশন দাখিল করেন।

নারাজি পিটিশনে তৈমূর আলম বলেন, গিয়াস উদ্দিনই সাব্বির আলম হত্যাকান্ডের মূল নায়ক। গিয়াস উদ্দিন ও তার সহযোগীদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা একটি গোঁজামিলের চার্জশিট দাখিল করেছেন। ফলে আদালত মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়। এরপর ছয় বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ বিচারিক হাকিম আদালতে (ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট) মামলার শুনানি চলে আসছিল। কিন্তু ২০০৭ সালের ১৮ এপ্রিল তৈমূর আলম খন্দকার যৌথবাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার ও ২০০৮ সালের মে-তে জামিনে মুক্তি পেলেও নানা অজুহাতে নারাজি প্রদানে বিরত ছিলেন। বরং তিনি বারবার মামলাটি বিলম্ব করেছেন।

এসব ব্যাপারে সাব্বির হত্যা মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন জানান, তৈমূর আলম খন্দকার আদালতে দাখিলকৃত নারাজি পিটিশনটি আবেদন করে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কারণ তৈমূর চাচ্ছেন মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি। নারাজি প্রত্যাহারের পর আদালত অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করার জন্য সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে। বর্তমানে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পিটিশনের ওপর সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

প্রসঙ্গত, এ চার্জশিট দেওয়ার পর থেকে তৈমূর আলম খন্দকার বারবার অভিযোগ করেন, মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের ব্যাপারে তদন্ত সংস্থা সিআইডির চরম গাফিলতি রয়েছে। মামলার প্রধান আসামি সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন ও তার সহযোগীদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা একটি গোঁজামিলের চার্জশিট দাখিল করেছেন। আসামিদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ সাপেক্ষে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তারা মামলা দুর্বল করে দিয়েছেন। কিন্তু ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে সিদ্ধিরগঞ্জে গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে তৈমূরের একটি সমঝোতা বৈঠক হয়। এতে গিয়াস উদ্দিন প্রস্তাব দেন, যদি সাব্বির হত্যা মামলা থেকে তাকে রেহাই দেওয়া হয় তা হলেই তিনি তৈমূরের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করবেন। ওই বৈঠকে তৈমূর ১০-১২ জন সিনিয়র নেতার সামনে ওয়াদা করেন এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নারাজি পিটিশন প্রত্যাহার করে গিয়াস উদ্দিনকে রেহাই দেন।

এ ছাড়া অন্তরালে রয়েছে নির্বাচনে কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার কানাঘুষা। এদিকে তৈমূরের এ সিদ্ধান্তে সাব্বির আলমের পরিবারের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাব্বির হত্যা মামলা নিয়ে শুরু থেকেই অন্য দুই ভাই তৈমূর ও খোরশেদ রাজনীতি করেছেন। বিশেষ করে গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে বিরোধ থাকায় তাকে এত দিন চাপে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তৈমূর। কিন্তু মেয়র হওয়ার লোভে সেই গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন তৈমূর। তিনি এ কাজ করে তার ভাইয়ের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছেন মেয়র হওয়ার লোভে। তৈমূরের গুপ্ত সমঝোতার বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় তার প্রতি বিএনপি নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে পরিবারের লোকজনও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তারা বলছেন, ভাইয়ের রক্তের সঙ্গে তৈমূর চরমভাবে বেইমানি করেছেন। নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁঁড়ানোর নির্দেশ সেই বেইমানির ফল। নিহত সাব্বির আলমের স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। এ ব্যাপারে তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, আসলে গিয়াস উদ্দিন নিজেও আমার সঙ্গে বেইমানি করেছেন। নির্বাচনের আগে আমার পক্ষে তার সর্বাত্মক পরিশ্রম করার কথা থাকলেও তা করেননি। বরং আমার বিরুদ্ধে নেপথ্যে কূটকৌশল করেছেন। আমি এখন আশা করি দ্রুত সাব্বির হত্যা মামলার বিচারিক কাজ শেষ হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category