বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১১:১৮ পূর্বাহ্ন
মানচিত্র প্রতীক

অনুমোদনহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি

স্টাফ রিপোর্টার :
কিশোরগঞ্জে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও কেজি স্কুল। বোর্ডের অনুমোদনবিহীন শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে। এসব প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে প্লে-গ্রুপ থেকে পঞ্চম বা নবম শ্রেণি পর্যন্ত। অথচ ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ধরণের প্রতিষ্ঠানের কোনো অনুমোদন নেই।
জানা গেছে, জেলায় বেসরকারি কেজি স্কুল ৪৫০টি, জুনিয়র স্কুল ২৭টি। তার মধ্যে অনেকগুলোয় মাধ্যমিক শাখা চালু রয়েছে। কিশোরগঞ্জের সবকটি উপজেলার অলিগলি বা পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুল। একটি কক্ষ বা একটি খুপরি ঘরে চলছে ‘কেজি’ নামে কথিত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দু-তিনটি কক্ষে ছোট ছোট খুপরি বানিয়ে চলছে এসব স্কুল। আবার কোথাও একটি কক্ষেই পরিচালিত হচ্ছে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল। গাদাগাদি করে পাশাপাশি টেবিলে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণির। আলো-বাতাসহীন ফ্ল্যাটে দিনের বেলায়ও আলো জ্বালিয়ে স্কুল চালানো হচ্ছে।
এসব স্কুলে সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষ্মানমাসিক, বার্ষিক নামে একাধিক পরীক্ষার আয়োজন রয়েছে। তবে কোনো ক্লাসেই ঠিকমতো পাঠদান হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষার নামে ইচ্ছামতো ফি আদায়, শিশুদের হাতে বইয়ের বোঝা দেওয়াসহ অযোগ্য শিক্ষক দিয়ে চলে এসব স্কুলের লেখাপড়া।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলার বিভিন্ন স্থানে বড় বড় সাইনবোর্ড ও ব্যানার নিয়ে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক রয়েছেন একই পরিবারের কয়েকজন। পাঠদানের অনুমতি না থাকায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো হয় অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের। এক্ষেত্রে সমাপনী পরীক্ষা দিতে এ স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের নিয়ে দ্বারস্থ হতে হয় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। অনুমতি আছে এমন স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয় অনুমতি না থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের।
জেলার এসব স্কুলে প্লে-গ্রুপে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কোনো বই না থাকলেও এ স্তরের শিশুদের বাংলা, গণিত, ইংরেজি, বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি ব্যাকরণ, জ্যামিতি, অ্যাকটিভ ইংলিশ, ধর্ম, সাধারণ জ্ঞান, পরিবেশ পরিচিতি, ওয়ার্ড বুক, ড্রয়িং বুকসহ ১৪টি ডায়েরি কিনতে বাধ্য করা হয়। নার্সারিতেও ১২টি বই ও ১৫টি ডায়েরি, কেজিতে এনসিটিবির তিনটি বইসহ ১২টি বই পড়ানো হচ্ছে। এভাবে প্লে-গ্রুপ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অতিরিক্ত বই পড়ানো হয়। কর্তৃপক্ষ বাড়তি লাভের জন্য শিক্ষার্থীদের এসব নিম্নমানের বই কিনতে বাধ্য করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা জানান, ডিগ্রি পাস করে চাকরি না পেয়ে স্কুল খুলেছেন। তার বন্ধুরাই স্কুলের শিক্ষক। এসব শিক্ষককে মাসিক এক হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার ৫০০ টাকা বেতন দেওয়া হয়। অতিরিক্ত বইয়ের বিষয়ে তিনি জানান, বেশি বই দেখলে বাচ্চারা খুশি হয়। তাই বেশি বেশি বই দিয়ে খেলার ছলে তারা শিশুদের শিক্ষা দেন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শুধু পরীক্ষার ফি-ই নয়, বেতনের ক্ষেত্রেও কোনো নীতিমালা নেই এসব স্কুলে। এছাড়া বার্ষিক ভর্তি ফিসহ নানা খাত দেখিয়ে বছরে মোটা অঙ্কের অর্থ গুনতে হয় তাদের। কর্তৃপক্ষ এত টাকা নিলেও ক্লাসে সঠিক শিক্ষা পায় না শিশুরা। শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস করাতে না পারলেও ব্যস্ত থাকেন টিউশনিতে। এভাবে মাসের পর মাস অভিভাবকদের গুনতে হয় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।
জেলা শহরের একটি স্কুলে অপেক্ষারত অভিভাবক খাদিজা আক্তার জানান, বাসায় সারা দিন চারদেয়ালে বন্দি থাকে বাচ্চাটা। স্কুলেও একই অবস্থা। পড়ার ফাঁকে একটু যে দৌড়াদৌড়ি করবে, সে জায়গাটুকুও নেই।
অতিরিক্ত পাঠ্যবই প্রসঙ্গে অভিভাবক কবির রহমান মান্না জানান, স্কুল থেকে সন্তানের জন্য যে পড়া দেওয়া হয়, তা তৈরি করতে দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয়। অনেক চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে চায় না।
জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো: জুলফিকার হোসেন জানান, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এ জেলায় রয়েছে প্রায় ৪০টির মতো অনুমোদনবিহীন কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ব্যাপারে প্রতি বছর ডিসেম্বরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে। অনেকগুলো দেউলিয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সুব্রত বণিক জানান, অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিবো।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোঃ হাবিবুর রহমান জানান, শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদনবিহীন কোনো স্কুল অথবা কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে না। আমরা তদন্ত করে দেখবো। অনুমোদনবিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পেলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category
themesbatulpar4545
%d bloggers like this: