মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ০৭:১৪ পূর্বাহ্ন

কারারক্ষীদের যোগসাজশে খুলনা কারাগারে রমরমা মাদক কারবার

খুলনা প্রতিনিধি;
খুলনা জেলা কারাগারে দীর্ঘদিন ধরে চলছে রমরমা মাদক কারবার। কারাবন্দি-কারারক্ষীদের শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেটের আওতায় অনেকটা প্রকাশ্যভাবেই চলছে এই মাদক কারবার। অভিযোগ রয়েছে, কারাগারের ভেতর অবৈধ এ কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন কয়েকজন কারারক্ষী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনা কারাগারের কয়েদি ও হাজতির একটা বড় অংশ মাদক সেবন, কারবার ও পাচার মামলার আসামি। তারা কারাগারের ভেতরে আসার পরেও মাদক সেবন ও কারবার অব্যাহত রেখেছে। বন্দিদের পাশাপাশি জমাদার ও কারারক্ষীদের একটি অংশ এ মাদক কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অসাধু কিছু কারারক্ষী ও কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও কয়েকজন দাগী কয়েদি মাদক কারবারের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আদালতে হাজিরা দিতে আসা বন্দিদের পায়ুপথ, বিশেষ প্যাকেট করে পাকস্থলিতে করে, গোপনাঙ্গে বেঁধে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, শার্ট-প্যান্টসহ নানা কৌশলে শরীরের বিভিন্ন অংশে মাদক নিয়ে কারাগারে ঢুকে পড়ে। এছাড়া কারা অভ্যন্তরে স্বজনদের দেওয়া খাবারের সঙ্গে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য প্রবেশ করছে।

কতিপয় কারারক্ষী মাদকদ্রব্য ভেতরে বহন করে নিয়ে মাদক কারবারির (কয়েদি) হাতে পৌঁছে দিয়ে আসে। সম্প্রতি অভিন্ন কায়দায় এক কয়েদির স্ত্রী গাঁজা নিয়ে তার স্বামীকে দেখতে আসে। এ সময়ে তাকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করেছিল কারারক্ষীরা।

গত বরিবার (১৩ অক্টোবর) খুলনা জেলা কারাগারে জেল সুপার মো. কামরুল ইসলাম, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আবেদন করেছেন, আদালতে হাজির করা, গারদে থাকাকালীন ও হাজিরা শেষে কারাগারে ফেরত পাঠানোর সময় মাদকের আসামিকে বিশেষ নজরে রাখার জন্য।

ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মাহফুজ নামের এক কয়েদি একজন মাদকসেবী। সে মাদকের একটি মামলায় এক বছর বিনাশ্রম ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ৩০ দিনের সাজাপ্রাপ্ত এবং আরেকটি মামলায় বিচারাধীন হিসেবে কারাগারে আছে। তাকে মাদক থেকে কোনোভাবেই সরানো যাচ্ছে না। গত ৬ সেপ্টেম্বর তার বিছানা তল্লাশি করে এক পোটলা গাঁজা পাওয়া যায়। ফলে তাকে নিরাপত্তা জনিত কারণে বিশেষ সেলে আটক রাখা হয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রী তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসলে আরপি গেটে তল্লাশি করে গাঁজা উদ্ধার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরে সে দণ্ডভোগ করে মুক্তি পায়। ফলে মাদকের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বন্দিদের কাছে কারা-কর্তৃপক্ষের বিব্রতকর ও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া এক ব্যক্তি বলেন, কারাগার কেন্দ্রিক মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের সদস্যরা কারাগারে মাদক প্রবেশের জন্য ব্যবহার করে হাজিরা দিতে আসা বন্দি ও কয়েদিদের। সিন্ডিকেটের লোকজন আদালত চত্বরে এসে বন্দিদের হাতে ছোট ছোট মাদকের পুঁটলি তুলে দেয়। ওই মাদকদ্রব্য বহন না করলে কারাগারে নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

ওই ব্যক্তি আরও বলেন, কারাগারে নির্যাতনের ভয়ে অনেকে মাদকদ্রব্য বহন করতে বাধ্য হন। পরে লুঙ্গি ও শার্টেও সেলাইয়ের ভাঁজের ভেতরে, শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ, টুথপেস্ট, আপেল ও সিগারেটের প্যাকেটে করে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় মাদকদ্রব্য।

খুলনা জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. কামরুল ইসলাম বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শুধু খুলনার কারাগারে নয়। সারা দেশের কারাগারের একই পরিস্থিতি। জেলা সৃষ্টির পর থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। মাদক সেবীরা পৃথিবীর সব জায়গায় মাদক সেবনের চেষ্টা করে। কারাগারে কয়েদিদের আমরা নজরদারিতে রাখি। মাদকসহ ধরা পড়লে বিচারের আওতায় নেওয়া হয়।

জেল গেটে তল্লাশির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘কারাগারে তল্লাশি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারে না। অনেক সময় তল্লাশি করেও মাদক পাওয়া যায় না। পরে যদি ধরা পড়ে আমরা ব্যবস্থা নিই। কারাগারে মাদকের ব্যবহার নিয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। মাদকের সঙ্গে যারই সম্পৃক্ততা থাকুক কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category
themesbatulpar4545
%d bloggers like this: