রবিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৯, ০৫:০৮ অপরাহ্ন

ঈদ আনন্দে মেতেছে রোহিঙ্গা শিশুরা

কক্সবাজার প্রতিনিধি :
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কর্তৃক জাতিগত নিধনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গারা ঈদুল আজহা উদ্‌যাপন করেছে।

সোমবার উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থীশিবিরে দেখা যায়- প্রায় ১১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গারা ঈদুল আজহা পালন করেছেন পরবাসে। তাদের অনেকের চোখে-মুখে বিষাদের রেখা দেখা দিলেও অধিকাংশদের মুখে ছিল হাসি ও আনন্দ। তবে এসব ক্যাম্প গুলোতে রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরদের ঈদ পালনে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। নতুন জামা-কাপড় পরে ঘোরাঘুরি আর স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া ছাড়াও দুরন্তপনা ও হই-হুল্লোড়ে মেতে ওঠে তারা। ঈদের দিনে কুতুপালং, বালুখালী ও মধুরছড়ার কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে এমনটি চিত্র দেখা গেছে।

২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইনে সে দেশের সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী মগদের অত্যাচারে দ্বিতীয় দফায় উখিয়া ও টেকনাফের বনভূমি আশ্রয় নেয় প্রায় ১১ লাখ ১৮ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। সে সময়ে জাতিসংঘের জরিপ মতে পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গাদের ৬০ শতাংশ শিশু রয়েছে। এদের মধ্যে ৩৬ হাজার শিশু শুধুমাত্র বাবা-মা দু’জনকে হারিয়েছে। জাতিসংঘের ইউনিসেফ সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকার এসব শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থানসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে।

এমনই এক রোহিঙ্গা শিশু মরিয়ম (১০)। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সে। নিজ দেশে দুঃসহ যন্ত্রণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে রাফিয়াদের এ দেশে পালিয়ে আসতে হলেও এবারের ঈদের আনন্দ যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। গায়ে নতুন জামা তো আছেই, মনের মতো করে সেজেছে সে।

শুধু রাফিয়া নয়, কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং-এর ডি-৫ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঠে মরিয়মের মতো হাজারো শিশু মেতেছে ঈদ আনন্দে। ঈদ মেলার পুরো মাঠজুড়ে নাগর-দোলাকে ঘিরেই দেখা গেল শিশুদের বাড়তি কৌতূহল। তবে বৃষ্টির কারণে এসব রোহিঙ্গা শিশুদের ঈদ আনন্দে একটু ভাটা পড়েছেও বটে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু মাত্র কুতুপালং ক্যাম্পে নয়, উখিয়া-টেকনাফের প্রায় ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এবার বাড়তি আনন্দ বিনোদের মধ্য দিয়ে ঈদ উদ্‌যাপন করেছে সকলে।

উখিয়ার কুতুপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইউনুছ আরমান বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি। এর মধ্যে সেই অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের অনেকেই সেই স্মৃতি ভুলতে বসেছে। যে কারণে এবারের ঈদ গতবারের চেয়ে অনেক আনন্দ দায়ক হয়েছে সবার জন্য।

গতবারের চেয়ে এবারে সাহায্য সহযোগিতা কম পাওয়া গেছে জানিয়ে রোহিঙ্গা নারী ছফুরা খাতুন বলেন, সময়ের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মনের অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ঈদ উপলক্ষে গত বছরের তুলনায় এ বছর কম সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া গেছে। যেকারণে সবাই ঈদ উদ্‌যাপন করতে পারেনি।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার আমাদের মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনে যেভাবে আশ্রয় দিয়েছে,খাবার-দাবার দিচ্ছে এ জন্য সরকারের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, গত দুই বছরে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন চলে এসেছে। ঈদের সময় শুধু শিশু নয়, বৃদ্ধদের গায়ে আমরা নতুন জামা দেখেছি। শিশুদের ঈদ আনন্দও ছিল গতবারের চেয়ে অনেক বেশি।

তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর কোরবানির ঈদে এক লাখ ২০ হাজার পরিবারের মধ্যে কোরবানির পশুর মাংস বিতরণ করা হয়েছে। প্রত্যেক পরিবারকে দুই কেজি করে মাংস বিতরণ করা হয়। এতে অন্তত ৫ হাজার পশু জবাই করে রোহিঙ্গাদের মাঝে মাংস বণ্টন করা হয়েছে। সরকার ও এনজিওরা মিলে এসব পশু কোরবানি দিয়েছে। একইভাবে স্থানীয়দের মাঝেও কোরবানির পশু বিতরণ করা হয়েছে’।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘এ বছর কোরবানির ঈদে রোহিঙ্গাদের মধ্যে যথা সম্ভব মাংস বিতরণ করা হয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত বিভিন্ন এনজিও, সংগঠন থেকে ও ব্যক্তিগত ভাবেও কোরবানির পশু দান করা হয়েছে’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category
themesbatulpar4545
%d bloggers like this: