মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০৩:৩৮ অপরাহ্ন

শোলাকিয়া হামলার ৩ বছর! আসামিদের উপস্থিতিতে ২২ জুলাই সাক্ষ্যগ্রহণ

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি :
কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার তিন বছর আজ। গুলশানের হলি আর্টিসানে নৃশংসতার পরপরই ২০১৬ সালের ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জে হামলা চালায় নব্য জেএমবির সদস্যরা। এ ঘটনায় করা মামলায় গত বছরের ২৮ নভেম্বর দুর্ধর্ষ পাঁচ জঙ্গি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, রাজিব গান্ধী, সোহেল মাহফুজ, আনোয়ার হোসেন ও জাহিদুল হক তানিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলাটিতে আগামী ২২ জুলাই কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত নং-১ এ সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য আছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে শোলাকিয়ার হামলা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এ জঙ্গি হামলায় ২৪ জনের সম্পৃক্ততার কথা অভিযোগপত্রে উঠে আসে। তাদের মধ্যে ১৯ জন বিভিন্ন এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ায় তাদের আসামির তালিকা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

তদন্তে উঠে আসে শোলাকিয়ার ইমাম মুফতি ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের ওপর হামলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জঙ্গিরা চাপাতি, বোমা এবং পিস্তল নিয়ে হামলা চালায়। জঙ্গিরা চাপাতি দিয়ে আনসারুল হক ও জহিরুল ইসলাম নামে পুলিশের দুই কনস্টেবলকে কুপিয়ে হত্যা করে। খবর পেয়ে অন্য পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে গিয়ে তাদের প্রতিরোধ করলে জঙ্গি আবির রহমান (২৩) গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জঙ্গি আবিরের বাড়ি কুমিল্লায়। এ ছাড়া পুলিশের সঙ্গে জঙ্গিদের গোলাগুলির সময় নিজ বাসায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝর্ণা রাণী ভৌমিক (৪০) নামে এক গৃহবধূ মারা যান। এক পর্যায়ে পুলিশ ও র‌্যাবের হাতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অপর জঙ্গি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এলাকার শফিউল ইসলাম (২২) ধরা পড়ে। কিশোরগঞ্জ শহরের পশ্চিম তারাপাশা এলাকার জাহিদুল হক তানিম (২৬) নামে এক যুবকও আটক হয়। শফিউল পরবর্তী সময়ে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়।

এ মামলায় সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) শাহ আজিজুল হক জানান, শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা মামলায় মোট ৭৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য আদালত গ্রহণ করবেন। এর আগের সাক্ষ্য গ্রহণের দুটি তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু আসামিরা হলি আর্টিসানসহ দেশের বিভিন্ন জঙ্গি হামলায় জড়িত। তারা এসব মামলারও আসামি এবং দেশের বিভিন্ন জেল-হাজতে থাকায় তাদের অনুপস্থিতির কারণে কিশোরগঞ্জের আদালত সাক্ষ্য নিতে পারেননি। আগামী ২২ জুলাই সবাইকে আদালতে উপস্থিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, শোলাকিয়া হামলায় খরচের যাবতীয় টাকা হুন্ডির মাধ্যমে সিরিয়া, সৌদি আরব ও পাকিস্তান থেকে আসে। জঙ্গি মো. বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ওই টাকা বাংলাদেশে আনে। বাশারুজ্জামান সেই টাকা নারায়ণগঞ্জে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম আহমেদ চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দেয়। এ ছাড়া ভারত থেকে আসে অস্ত্র ও গোলাবারুদ। বড় মিজানের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জে তামিম চৌধুরীর কাছে সেই অস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছে দেয় নুরুল ইসলাম মারজান।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার কাছে জঙ্গি মাহফুজুর রহমান বিজয় ওরফে সুজনের ভাড়া বাসায় শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার বিষয়ে একটি বৈঠক হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের ২৪ জুন রাজধানীর বসুন্ধরায় অ্যাপোলো হাসপাতালের পেছনে তানভীর কাদেরীর বাসায় আবার পরিকল্পনা হয়। এ পরিকল্পনায় রাজিব গান্ধী, তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহান, নুরুল ইসলাম মারজান, বাশারুজ্জামান চকলেট, তানভীর কাদেরী, খাইরুল ইসলাম ওরফে বাঁধন ওরফে পায়েল, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিমল ওরফে নাহিদ, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামীহ মোবাশ্বের ও মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিল। পরবর্তী সময়ে হামলার তিন দিন আগে ৪ জুলাই মিরপুরে শেওড়াপাড়ার একটি বাসায় নুরুল ইসলাম মারজান, সারোয়ার জাহান ওরফে আব্দুর রহমান ও রাজিব গান্ধী- এই তিন জঙ্গি শোলাকিয়ায় হামলার বিষয়ে আরও একটি পরিকল্পনা সভা করে। ওই সভায় শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে হত্যা করা হবে- মর্মে সিদ্ধান্ত হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নব্য জেএমবির মাস্টারমাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী, মেজর (অব.) জাহিদ, ফরিদুল ইসলাম আকাশ, আবির রহমান, শরীফুল ইসলাম ওরফে শফিউল ইসলাম ও জাহিদুল হক তানিম কিশোরগঞ্জ শহরের নীলগঞ্জ রোড এলাকার ভাড়া বাসায় অবস্থান নেয়। পরবর্তী সময়ে ৭ জুলাই ঈদের দিন সকালে শোলাকিয়ার ইমামকে হত্যা করার জন্য জঙ্গি আবির রহমান ও শরীফুল ইসলাম ওরফে শফিউল ইসলামকে অপারেশনে পাঠিয়ে তামিম আহমেদ চৌধুরী, জাহিদ ও ফরিদুল ইসলাম আকাশ কিশোরগঞ্জ ত্যাগ করে। তবে তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের তৎপরতা নস্যাৎ করে দেয় তাদের সব ছক। তল্লাশির মুখে পড়ে চাপাতি ও বোমা নিয়ে পুলিশের ওপর হামলে পড়ে জঙ্গি আবির ও শরীফুল। এ সময় প্রতিরোধ গড়েন চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা। সকাল পৌনে ৯টায় জঙ্গিদের এই হামলায় ১৪ পুলিশ সদস্য আহত হন। তাদের মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম তপুর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া কনস্টেবল আনসারুল হককে ময়মনসিংহ সিএমএইচে নেওয়ার পর ওই দিনই দুপুরে তার মৃত্যু হয়। শোলাকিয়ার সবুজবাগ মোড় পুলিশ চেকপোস্টে আক্রান্ত হওয়ার পরপরই হামলাকারী জঙ্গিদের ধরতে অভিযানে নামে পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে জঙ্গিদের প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ চলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category
themesbatulpar4545
%d bloggers like this: