সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ০৮:২৫ অপরাহ্ন

মেছো বাঘ কিংবা চিতাবাঘ নয়: এই প্রাণীর নাম ‘বড় খাটাশ’!

স্টাফ রিপোর্টার:
গতকাল সকালে কটিয়াদী পৌরসদরের ভোগপাড়া গ্রামে বিরল প্রজাতির একটি প্রাণী আটক করে এলাকাবাসী। এই সংবাদটি ‘স্থানীয় জনপ্রিয় অনলাইন মাল্টিমিডিয়া পোর্টাল ‘কটিয়াদী প্রবাহে’ প্রকাশ হলে কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ভাইরাল হয়ে পরে।

এরকম বিরল প্রজাতি প্রাণী আর কখনো এই এলাকার সাধারণ মানুষের চোখে পড়েনি। এতে করে অনেকের মনে আলোচনার খোরাক হয়ে দাড়িয়েছে এই প্রাণীর বিষয়টি।

সকলের মনে যখন জল্পনা-কল্পনা তখন প্রাণীটির সঠিক তথ্য জানতে অনুসন্ধানে ‘কটিয়াদী প্রবাহ’।

অনুসন্ধান শুরুতেই জানা গেলো এরা, বাঁশবন-ঘাসবন, শুকনো কাশবন, খড়বন, জালিবেতঝাড়, ইটের পাঁজা ও ঝোপঝাড় হচ্ছে ছোট খাটাশের আবাসস্থল। নিরীহ স্বভাবের প্রাণী। ‘বড় ভাই’ বড় খাটাশ (Large indian civet) ছোট দুই ভাই ‘সারেল’ (palm civet) ও ‘পাহাড়ি সারেল’-এর (Himalayan palm civet) মতোই সর্বভুক।

ছোট খাটাশ গাছে চড়তে ওস্তাদ। মাটিতেও সমান সচল, ভালো দৌড়বিদ এবং অল্প জায়গায় আত্মগোপনে পারদর্শী। ছোট খাটাশ ‘গন্ধগোকুল’ নামেও এলাকাভেদে পরিচিত। ইংরেজি নাম Small indian civet। বৈজ্ঞানিক নাম Viverlculla indica। ওজন তিন থেকে পাঁচ কেজি। শরীরের মাপ লেজ বাদে ৯০ থেকে ৯৩ সেন্টিমিটার, লেজ ৩০ সেন্টিমিটার।

বড় খাটাশ ও সারেল বৃহত্তর খুলনা জেলাসহ সারা দেশে মোটামুটি টিকে থাকলেও ছোট খাটাশ কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। অথচ, বড় ও ছোট দুই ভাইয়ের তুলনায় এদের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কথা ছিল। আবাস ও নিরাপত্তার সংকটের কারণেই এরা একেবারে কমে গেছে, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে, তা গবেষণাযোগ্য। পাতিশিয়ালের তুলনায় খ্যাঁকশিয়ালও (Fox) কমল কেন, এটাও স্পষ্ট নয়।

মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর খুলনা জেলার গ্রামীণ বনে এরা ছিল সন্তোষজনক হারে। এখন নজরেই পড়ে না বলতে গেলে। ছোট খাটাশ নাকি কানে কম শোনে, ফকিরহাট-বাগেরহাটে তাই এর প্রচলিত নাম ‘ঘোইলো’। এ বিষয়টিও গবেষণা করে দেখা যেতে পারে। ছোট খাটাশ বছরে একাধিকবার বাচ্চা দেয়। বন্যা-জলোচ্ছ্বাসে বন-বাগান, মাঠঘাট ডুবে গেলে এরাই বেশি অসহায় হয়ে পড়ে। এ রকম ক্ষেত্রে অনেক দয়ালু মানুষ এদের খাদ্য সরবরাহ করে থাকেন। সম্ভব হলে অন্য প্রাণীদের খাদ্য দিতে চেষ্টা করেন।

ছোট খাটাশের পশ্চাদ্দেশে বাড়তি একটা সুগন্ধি গ্রন্থি আছে। দুর্গন্ধি গ্রন্থি তো আছেই। এরা নিশাচর প্রাণী। বাঁচে ১০ থেকে ১৫ বছর। বয়স ৮-৯ বছর হলে ওজন বেশ বাড়ে। আকারে ছোট হলেও খাদ্যতালিকা এদের বিশাল। প্রায় সব ধরনের ফল, বিভিন্ন ছোট প্রাণী ও পতঙ্গ, তাল-খেজুরের রস ইত্যাদি। নিজেরা গর্ত করে আশ্রয়স্থল বানায় এবং সেখানেই বাচ্চা প্রসব করে। ছানারা জন্ম নেয় চোখ খোলা অবস্থাতেই। বাদামি শরীরে এদের ছাই ও হালকা হলুদাভ আভা থাকে।

পিঠের ওপর ও দুই পাশে টানা পাঁচ-ছয়টি বাদামি কালো রেখা। শরীরের উভয় পাশে গোল গোল একই রঙের বুটি আঁকা। বয়সভেদে লেজে পাঁচ-সাতটি চওড়া বলয় থাকে। কান থানকুনি পাতার মতো। চোখ দুটি সদ্য খোসা ছাড়ানো পাকা বৈচি ফলের মতো। ঘাড়ে দুটি ও গলায় তিনটি কালো রেখা আছে। শৈশব-কৈশোরে প্রাণীটির সঙ্গে দেখা হতো প্রায় নিত্যই, আজ আর ওদের দেখাই পাই না বলতে গেলে।

গন্ধগোকুল (ইংরেজি: Asian palm civet; বৈজ্ঞানিক নাম: Paradoxurus hermaphroditus) ‘সাধারণ বা এশীয় তাল খাটাশ’, ‘ভোন্দর’, ‘নোঙর’, ‘সাইরেল’ বা ‘গাছ খাটাশ’ নামে পরিচিত। তালের রস বা তাড়ি পান করে বলে তাড়ি বা টডি বিড়াল নামেও পরিচিত। গন্ধগোকুল বর্তমানে অরক্ষিত প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। পুরোনো গাছ, বন-জঙ্গল কমে যাওয়ায় দিন দিন এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

মাথার খুলি এবং দন্তোদগমের চিহ্ন এরা মাঝারি আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী। নাকের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত ৯২-১১২ সেন্টিমিটার, এর মধ্যে লেজই ৪৪-৫৩ সেন্টিমিটার। [৩] লেজের দৈর্ঘ্য ৪৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আকার ৫৩ সেন্টিমিটার। [৪] ওজন ২.৪-৫.০ কেজি। স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে গন্ধগ্রন্থি থাকে। গন্ধগোকুলের গাট্টাগোট্টা দেহটি স্থূল ও রুক্ষ বাদামি-ধূসর বা ধূসর-কালো লোমে আবৃত। [৩]

স্বভাব

কিশোরবয়স্ক এশিয়ান তাল খাটাশ বা গন্ধগোকুল। ফিলিপাইনের গন্ধগোকুল
গন্ধগোকুল নিশাচর। খাটাশের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এরাই মানুষের বেশি কাছাকাছি থাকে। দিনের বেলা বড় কোনো গাছের ভূমি সমান্তরাল ডালে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে, লেজটি ঝুলে থাকে নিচের দিকে। মূলত ফলখেকো হলেও কীটপতঙ্গ, শামুক, ডিম-বাচ্চা-পাখি, ছোট প্রাণী, তাল-খেজুরের রসও খায়। অন্য খাদ্যের অভাবে মুরগি-কবুতর ও ফল চুরি করে। এরা ইঁদুর ও ফল-ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে। গন্ধগোকুলের ধূসর রঙের এই প্রাণীটির অন্ধকারে অন্য প্রাণীর গায়ের গন্ধ শুঁকে চিনতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। প্রায় পোলাও চালের মতো তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে থাকে। একসময় এর শরীরের গন্ধ উৎপাদনকারী গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত রস সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহূত হতো। বর্তমানে কৃত্রিম বিকল্প সুগন্ধি তৈরি হয়।

প্রজননকাল
স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে গন্ধগ্রন্থির নিঃসরণের মাধ্যমে নিজেদের সীমানা নির্ধারণ করে। মূলত একাকী হলেও প্রজননের সময় স্ত্রী-পুরুষ একত্রে থাকে। বছরে সাধারণত দুবার প্রজনন করে। গর্ভধারণকাল দুই মাসের কিছু বেশি। পুরোনো গাছের খোঁড়ল ছানা প্রসবের উপযুক্ত স্থান। কিন্তু খোঁড়লের অভাবে গাছের ডালার ফাঁকে, পরিত্যক্ত ঘর বা ইটের ভাটা, ধানের গোলা, তাল-সুপারির আগায় ছানা তোলে। প্রতিবার ছানা হয় তিনটি। ছানারা চোখ খোলে ১০-১২ দিনে। মা-গন্ধগোকুল দেহের সঙ্গে লেজ মিলিয়ে একটি বৃত্তের সৃষ্টি করে। ছানারা কখনোই বৃত্তের বাইরে যায় না। প্রায় ছয় মাস বয়সে ছানারা সাবালক হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category
themesbatulpar4545
%d bloggers like this: