রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ০১:২৮ অপরাহ্ন

শোলাকিয়ায় বৃষ্টিতেও জনসমুদ্র

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি :
প্রতিবারের মতো এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হলো কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায়। বুধবার (৫ জুন) মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে আসা দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লির ভিড়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় শোলাকিয়া ময়দান।

দেশের সর্ববৃহৎ এ জামাতে অংশগ্রহণ করতে সকাল থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে জেলা শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত শোলাকিয়া ঈদগাহের উদ্দেশ্যে। বৃষ্টিতে ভিজে, ছাতা ও জায়নামাজ মাথায় দিয়ে মুসল্লিরা সমবেত হন শোলাকিয়া ঈদগাহে। জামাত শুরুর আগেই সাত একর আয়তনের শোলাকিয়া মাঠ পূর্ণ হয়ে যায়। আগত মুসল্লিদের অনেকে মাঠে জায়গা না পেয়ে পার্শ্ববতী রাস্তা, তিনপাশের ফাঁকা জায়গা, নদীর পাড় ও শোলাকিয়া সেতুতে জায়গা করে নিয়ে জামাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েন।

রাতের টানা বৃষ্টির পর সকালে শুরু হয় অঝর ধারায় বৃষ্টি। এতে ঈদগাহ ময়দান, রাস্তা ও আশেপাশের এলাকা কর্দমাক্ত হলেও এর উপর পলিথিন ও জায়নামাজ বিছিয়ে মুসল্লিরা প্রস্তুতি নেন জামাতের। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ ২২ মিনিট দেরিতে ঈদগাহ ময়দানে পৌঁছান। কর্দমাক্ত মাঠ আর কয়েক ঘন্টার টানা বৃষ্টিতে মুসল্লিরা স্নাত হলেও আল্লাহর সান্নিধ্য ও অনুকম্পা পেতে ব্যাকুল ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বৃষ্টিতে ভিজেই বৃহত্তম এ ঈদ জামাতের নামাজ আদায় করেছেন। সকাল ১০টা ২৪ মিনিটে প্রতিকূল পরিবেশ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে শোলাকিয়ার দেশের সর্ববৃহৎ এ ঈদ জামাতে নামাজে শরিক হন তাঁরা।

মাঠের সুনাম ও জনশ্রুতির কারণে ঈদের বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সারাদেশের বিভিন্ন জেলা তথা ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, জামালপুর, খাগড়াছড়ি, শেরপুর, যশোর, খুলনা ও চট্রগ্রামসহ অধিকাংশ জেলা থেকে শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের সমাগম ঘটে। এদের অনেকে ওঠেন হোটেলে, কেউবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ও মাঠ পরিচালনা কমিটির ব্যবস্থাপনায় শোলাকিয়া ঈদগাহ সংলগ্ন কুমুদিনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আবার অনেকেই কোথাও জায়গা না পেয়ে রাত কাটান জেলা সদরের বিভিন্ন মসজিদে।

ঈদের দিন শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে চলাচল করেছে ২টি স্পেশাল ট্রেন। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে আসে এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌনে ৬টায় ছেড়ে আসে।

১৮২৮ সালে অনুষ্ঠিত ঈদের প্রথম বড় জামাতের হিসাব অনুযায়ী শোলাকিয়া ময়দানে এবার ছিল ১৯২তম ঈদ জামাত। জামাতকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিপুল সংখ্যক পুলিশ, আর্মড পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তা ও নজরদারিতে শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মাঠের চারপাশে বসানো হয় নিরাপত্তা চৌকি। মাঠের ৩২টি প্রবেশ পথে চেকপয়েন্ট বসিয়ে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে মুসল্লিদের দেহ তল্লাশি করা হয়।

সকাল ১০টায় জামাত শুরু হওয়ার কথা থাকায় রেওয়াজ অনুযায়ী ১৫, ৫ ও ১ মিনিট আগে শর্টগানের ফাঁকা গুলির আওয়াজ করে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ায় ইমামের বিলম্বে পৌঁছার কারণে জামাত শুরু হয় ১০টা ২৪ মিনিটে। জামাতে এবারও ইমামতি করেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ। জামাত শেষে ইমাম তাঁর বয়ানে দেশ ও জাতির উন্নতি, সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর সংহতি ও ঐক্য কামনা করেন। এছাড়া দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মাহর জন্য মঙ্গল কামনা এবং পাপ থেকে মুক্তির জন্য বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন তিনি। লাখো মুসল্লিদের উচ্চকিত হাত আর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আমীন, আমীন ধ্বনিতে এ সময় মুখরিত হয়ে উঠে পুরো ঈদগাহ এলাকা।

ঈদ জামাত শুরুর আগে ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার), কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাহমুদ পারভেজ ও ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহদী হাসান মুসল্লিদের স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন।

জনশ্রুতি রয়েছে যে, ১৮২৮ সালে প্রথম বড় জামাতে এই মাঠে একসঙ্গে ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাৎ সোয়ালাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেন। এই সোয়ালাখ থেকে এ মাঠের নাম হয় ‘সোয়ালাখিয়া’, যা উচ্চারণ বিবর্তনে হয়েছে শোলাকিয়া। অপর একটি ধারণা হচ্ছে, মোগল আমলে এখানে পরগনার রাজস্ব আদায়ের একটি অফিস ছিল। সেই অফিসের অধীন পরগণার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। এটাও ‘শোলাকিয়া’ নামকরণের উৎস হতে পারে। তবে প্রথম ধারণাটি জনসাধারণের মাঝে অধিক প্রচলিত রয়েছে।

এ ঈদ জামাতকে উপলক্ষ করে জেলা প্রশাসন, পৌর প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মুসল্লিদের শুভেচ্ছা জানিয়ে মাঠ সংলগ্ন রাস্তায় তোরণ নির্মাণ, ব্যানার-ফেস্টুন টানানো, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, জরুরী স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি ও কর্মব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মত।

শত ব্যস্ততা, নানা সমস্যা আর প্রাকৃতিক বৈরিতাকে উপেক্ষা করে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ধনী-গরীব সকলে নামাজ আদায় করেন শোলাকিয়া ঈদ জামাতে। তাঁদের সবার উদ্দেশ্য একটাই যেন কোন অবস্থাতেই হাত ছাড়া হয়ে না যায় জামাতে অংশগ্রহণ, পাপ থেকে মুক্তি আর আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ। ধনী-গরীবের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সাম্য ও সুন্দরের ভিত্তিতে এক নতুন সমাজ গড়ার এই শিক্ষা নিয়েই জামাত শেষে বাড়ির পথে শোলকিয়া ছাড়েন তাঁরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category
themesbatulpar4545
%d bloggers like this: