রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ০১:২৭ অপরাহ্ন

নান্দাইলে ভন্ড পীরের দেওয়া পানি খেয়ে শিক্ষার্থীর মুত্যু

নান্দাইল প্রতিনিধি :
তানিয়া আক্তার ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নানা জায়গায় তাঁর চিকিৎসা চলছিল।

এমন অবস্থায় ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার তারেরঘাট এলাকার কথিত পীর লিয়াকত আলী খানের আস্থানাতেও যাওয়া আসা করতেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ওই পীরের আস্থানায় এসে লাইনে দাঁড়িয়ে পানিপড়া খেয়েই মুত্যৃর কোলে ঢলে পড়েন ওই শিক্ষার্থী।

এ ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হলেও তানিয়ার পরিবারকে না জানিয়েই পীরের নির্দেশেই তানিয়ার জানাজা সম্পন্ন করে লাশ নেওয়ার জন্য খবর পাঠানো হয়। পরে গতকাল শুক্রবার বিকেলে পরিবারের লোকজন এসে কাফন পড়ানো অবস্থায় তানিয়ার লাশ নিয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত তানিয়া গৌরীপুর উপজেলার অচিন্তপুর ইউনিয়নের অচিন্তপুর গ্রামের বড়বাড়ির মো. বাচ্চু মিয়ার মেয়ে। তাঁর চাচা মো. মহসিন আলী আকন্দ জানান, তানিয়া গৌরীপুর সরকারি কলেজ থেকে এবার দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছে। তাঁর তিনভাই এক বোনের মধ্যে সে সবার ছোট।

গত তিন বছর ধরে তানিয়া হৃদরোগে আক্রান্ত ছিল। এই অবস্থায় বিভিন্ন জায়গায় তাঁর চিকিৎসা চলছিল।

এর মধ্যে কোনোভাবেই তানিয়া আরোগ্য হচ্ছিল না। এক পর্যায়ে তানিয়া জানতে পারে, নান্দাইলের তারেরঘাট এলাকার কথিত পীরের বাড়ির কথা। সেখানে হৃদরোগ ছাড়াও যেকোনো রোগের চিকিৎসা চলে পানিপড়া ও লাঠির আঘাতে। সেখানেই বেশ কিছুদিন ধরে যাচ্ছিল তানিয়া। সেখান থেকে এসে পীরের নির্দেশে তানিয়া বিষেশজ্ঞ চিকিৎসকদের দেওয়া প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়। পীর তাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁর এখানে আসা যাওয়া করলে কোনো ধরনের ওষুধ সেবন করা যাবে না।

এই অবস্থাতেই তানিয়া গত তিন বছর ধরে প্রতি শুক্রবার এক রকম কাহিল শরীর নিয়েও পীরের আস্থানায় যেত। তানিয়ার চাচা মহসিন আরো জানান, গত দুই মাস ধরে তানিয়ার ওই পীরের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ ছিল। গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ তানিয়া তাঁর মাকে জানায় ঈদের আগে শেষ শুক্রবার সে আবারও পীরের বাড়িতে যাবে। তাঁর এই ইচ্ছায় গতকাল শুক্রবার সকালে নান্দাইলের ওই পীরের বাড়িতে যায়।

এরপর তাঁর (তানিয়া) মোবাইল থেকেই পরিবারের কাছে মৃত্যুর খবর পাঠানো হয়। বিকেল ৩টার দিকে তিনিসহ তানিয়ার আরেক চাচা ও চাচি ঘটনাস্থলে এসে কাফন পড়ানো অবস্থায় লাশ নিয়ে যায়। এ সময় তাঁরা জানতে পেরেছেন তানিয়া প্রচণ্ড গরমের মাঝে এসেই আগত অন্য রোগীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে পীরের ফুঁ দেওয়া পূর্বের রাখা পানিপড়া মাথায় ছিটিয়ে ও খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করে। এই অবস্থায় পীরের নির্দেশে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গোসল শেষে কাফন পড়িয়ে জানাজা সম্পন্ন করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে পীর মো. লিয়াকত আলী খানের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে ওই আস্তানার প্রধান হুজুর হিসেবে খ্যাত হযরত মাওলানা মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম রফিকি সাহেব বলেন, লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় মাটিতে ঢলে পড়ার খবর পেয়ে কাছে এসে দেখেন মেয়েটি মারা গেছে। পরে পীর সাহেবের নির্দেশে গোসল করিয়ে জানাজা সম্পন্ন করে ওই মেয়েটির মোবাইলেই পরিবারের কাছে মৃত্যুর খবর জানানো হয়। কি রোগ নিয়ে এখানে মেয়েটি আসতেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, হার্ডঅ্যাটাক হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল। সর্বশেষ ভরসা নিয়ে এখানে আসতেন।

প্রসঙ্গত, ’এই পীরের কর্মকাণ্ড নিয়ে কালের কণ্ঠে ‘মারলে ডান্ডা রোগ হয় ঠান্ডা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার ঝড় বয়। কিন্তু প্রশাসনের লোকজন কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। প্রতি শুক্রবার ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের নান্দাইলের তারেরঘাট এলাকার মাইজহাটি নামক স্থানে দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে করে শত শত লোকজন ওই পীরের আস্তানায় সমাগম ঘটে। সকল রোগের চিকিৎসাই হচ্ছে পানি পড়া ও পীরের লাঠির আঘাতে।

খোঁজ নিয়ে জানায়, পীর লিয়াকত আলী বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর চাকরিচ্যুত হয়ে বাড়িতে আসার পরই নিজেকে পীর হিসেবে দাবি করে চিকিৎসা শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি অঢেল সহায় সম্পদের মালিক বনে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category
themesbatulpar4545
%d bloggers like this: