মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৬:০৪ অপরাহ্ন

শেষে এসে ইবাদত যেন ম্লান না হয়

মুফতি, শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক।
রমজান শুরুর ভাবগাম্ভীর্য রমজানের শেষে এসে অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। এটা সাধারণত হয় রমজানের শেষে এসে ঈদের কেনাকাটার চাপ, বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি, ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা ইত্যাদি কারণে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। আমরা রমজানকে বরণ করেছিলাম যে আবেগে, শেষও করতে হবে সেভাবে।

কারণ ইসলামে ইবাদত-বন্দেগির ভিত্তিগুলো এমন একটা ইমারতের ওপর দাঁড়িয়ে, যা শুধুমাত্র অন্তস্তলের মূল একাগ্রতা হতে উৎসারিত। যে একাগ্রতা একজন মানুষকে তার ভেতর থেকে পরিবর্তন করে দেয়। যেহেতু ইসলামের ইবাদত-বন্দেগির মাঝে আনুষ্ঠানিকতার কোনো প্রাধান্য নেই সেহেতু ইসলামে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু রমজানের শেষ সময়ের চিত্র দেখে মনে হয়, আমাদের ইবাদত-বন্দেগিগুলো ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ইবাদত-বন্দেগিগুলোকে আনুষ্ঠানিকতায় রূপ দিতে গিয়ে নিজেকে ভেতর থেকে পরিবর্তন করতে পারছে না। আবার সামষ্টিক ইবাদতের ফলে ব্যক্তি ও সমাজে যে পরিবর্তন আসার কথা ছিল তাও অনুপস্থিত। প্রতি বছর রমজান মাস এলে আমরা ঘটা করে রোজা পালন করি। কিন্তু রমজান মাস শেষ হলে রোজা পালনকারীদের মাঝে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। এর কারণ হলো আমরা রোজার আনুষ্ঠানিক দিক পালনে বেশ যত্নবান, কিন্তু অভ্যন্তরীণ দিকের প্রতি আমাদের খেয়াল কম। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, ইফতার ও ঈদ আয়োজনের কথা। এ দু’টোই স্বতন্ত্র ইবাদত, যা একান্ত রোজার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু সমাজে এর ভিন্ন চিত্র দৃশ্যমান।

এক্ষেত্রে বলা যায়, মানুষ যদি রোজার মৌলিক দর্শন ও শিক্ষার প্রতি যত্নবান হতো তাহলে মুসলিম জীবন ও মুসলিম সমাজে এক বিরাট পরিবর্তন আসত। আর এ পরিবর্তন আসাটা ছিল স্বাভাবিক। কারণ রোজা শুধুমাত্র সারা দিন উপোস থাকার জন্য আসেনি, বরং রোজার মূল লক্ষ্য হলো তাকওয়ার গুণ তৈরি করা।

দেখুন, একদিকে চলছে সিয়াম সাধনা অপরদিকে চলছে সামাজিক নানা অন্যায়, অনাচার ও অবিচার। তাহলে রোজা পালনকারীর আত্মার উৎকর্ষ সাধন কোথায় হলো? মূলত রোজা এই ঘোষণা দেয় যে, প্রকাশ্য ও গোপন সব অবস্থায় একজন ব্যক্তি শুধু আল্লাহতায়ালার আনুগত্য করবে এবং সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলে নিজে, নিজের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিশুদ্ধ করবে। কিন্তু ঘটছে তো এর উল্টোটা। এ প্রবণতা থেকে সবাইকে বের হয়ে আসতে হবে। রোজার শিক্ষাকে নিজের ভেতরে লালন ও ধারণ করতে হবে।

আমরা জানি, এ দেশের মানুষ ধর্মভীরু। অন্য সময়ের তুলনায় রমজানে ভালো ও নেক কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়, হৃদয়ে ঝোঁক সৃষ্টি হয় ইবাদত-বন্দেগির। এই সুযোগে সমাজে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বারণের গতি বাড়িয়ে দিতে হবে। মানুষের সামনে আল্লাহর ভয়ের স্বরূপ, আল্লাহর নেয়ামতের কথা, রমজানের হাকিকত এবং রোজার আদব-আহকাম ইত্যাদি সম্পর্কে বেশি বেশি আলোচনা করতে হবে।

বস্তুত বুদ্ধিমান ওই ব্যক্তি, যে রমজানকে আত্মসমালোচনার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। নিজ অন্তরের বক্রতাকে সোজা করার মোক্ষম সময় মনে করে। আল্লাহর ভয়ে নফসকে ইবাদতের প্রতি বাধ্য করতে পারে। রোজার উদ্দেশ্য সাধনে পথ চলতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা যেভাবে রমজানকে স্বাগত জানিয়েছি, সে ভাবে সময়ের হিসাবে এ মাস বিদায়ও নেবে। আমরা কিন্তু কেউই জানি না, শেষ পর্যন্ত রোজা রাখার সুযোগ আমাদের হবে কিনা। আমরা তো প্রতিনিয়ত অনেক মানুষের মৃত্যুর খবর পাই, অনেকের জানাজা পড়ি, দাফন করি। যাদের সঙ্গে আমরা অতীতে রোজা রেখেছি, ইফতার করেছি, তাদের সবাই কি আমাদের মাঝে আছে? এটাই দুনিয়ার কঠিন বাস্তবতা। তাই আসুন, আলোকিত এই মাসে বেশি বেশি সৎকাজ করি। এ মাসে আল্লাহতায়ালার সঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ হই, তওবা করি, অতীতের পাপের জন্য অনুতপ্ত হই। শপথ নিই পাপের পথ থেকে ফিরে আসার। দোয়া করি নিজের জন্য, আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ও গোটা মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য।

লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category
themesbatulpar4545
%d bloggers like this: