FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ - ১:৩৮ অপরাহ্ণ

৪ দিন মাকে কাঁধে নিয়ে অছিউর

82041_31

x

অনলাইন ডেস্ক:
মিয়ানমার থেকে পাহাড়, জঙ্গল, ঝোপঝাড় পেরিয়ে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির চোখ ফাঁকি দিয়ে ৪ দিন ধরে গর্ভধারিণী মাকে কাঁধে নিয়ে হোয়াইক্যং লম্বাবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে মণ্ডুু সবরদি বিল গ্রামের অছিউর রহমান (৪৪)। তার কাঁধে ৭৫ বছরের বৃদ্ধ মা মমতাজ বেগম। বয়সের কারণে তিনি খুব একটা হাঁটতে পারেন না। তাই ছেলে অছিউর ৪ দিন ধরে মাকে কাঁধে নিয়ে বয়ে বেড়িয়েছেন সীমান্তের বিভিন্ন অঞ্চল। কখনো জঙ্গলে, কখনো পাহাড়ে রাত কেটেছে মা-ছেলের। মিয়ানমার থেকে সঙ্গে আনা যৎসামান্য শুকনো খাবার বৃদ্ধ মাকে খাইয়েছেন। তাও আবার তিনদিন। একদিন ধরে অভুক্ত তার মা। আর ছেলে অভুক্ত ৪ দিনের। তাই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা মাত্রই খিদের জ্বালায় কান্না জুড়ে দেন অছিউর রহমান। গত বুধবার হোয়াইক্যং লম্বাবিল সীমান্ত সরজমিন পরিদর্শনকালে অছিউর রহমান জানান, পরিবারের অন্য সদস্যরা কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশে পাড়ি জমায়। মা ও ছেলে ছিল মিয়ানমারে। কিন্তু মিয়ানমার বাহিনী যখন একের পর এক গ্রাম পেট্রল দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল, তখন সে মাকে কাঁধে নিয়ে পালাতে থাকে, ৪ দিন ধরে বিভিন্ন জঙ্গল পেরিয়ে অবশেষে লম্বাবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। শুধু মা, ছেলে নয়, সীমান্তজুড়ে এখন অসংখ্য কাহিনী। কেউ বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে এসেছেন, কেউ কাঁধে করে নিয়ে এসেছেন প্রতিবন্ধী বোনকে। সবার মুখে হতাশা ও আতঙ্কের ছাপ। স্থানীয় জনগণ নতুন আসা রোহিঙ্গাদের শুকনো খাবার দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। পরিদর্শনকালে লম্বাবিল সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের বর্ণনায় যা উঠে আসে তা হৃদয়বিদারক, লোমহর্ষক। দুই শিশু সন্তান নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে আসা ফাতেমা বেগম (২৫) জানান, তার স্বামী বাড়ির পাশে লুকিয়ে ছিল। এ সময় সেনাবাহিনী ও রাখাইন সম্প্রদায়ের একটি দল তাকে ধরে নিয়ে যায়। কেরোসিনের আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয় তার ঘর। জীবন বাঁচাতে দুটি সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে, স্বামীর কি অবস্থা এখনো জানে না সে। মংণ্ডু পোয়াখালী গ্রামের জমিলা খাতুন (৪৫) জানায়, তারা মিয়ানমার বাহিনীর আক্রমণে দিশাহারা হয়ে সেদেশের সীমান্ত এলাকার খেয়াবনে কিছু না খেয়ে ৫ দিন আত্মগোপন করেছিলেন। পরে ৭ দিন পায়ে হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। জমিলা জানান, তার পাশের বাড়িটি লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলে তার বাড়িটিও পুড়ে যায়। মংণ্ডু পোয়াখালী গ্রামের সব হারিয়ে নিঃস্ব মমতাজ বেগম (৪০) জানায়, সেনা সদস্যরা তাদের গ্রামে লুটপাট চালিয়ে মেয়েদের ইজ্জত লুণ্ঠন করছে। ছেলেদের ধরে নিয়ে জবাই করে মারছে। ছোট ছোট ছেলেদের আগুনে নিক্ষেপ করছে। নৃশংস এ বর্বরতার হাত থেকে রেহায় পাওয়ার জন্য ছেলে-মেয়ে নিয়ে এখানে চলে এসেছি। স্বামীহারা সাজু বেগম (২৫) জানায়, পুলিশ তার স্বামী ইউনুছকে ধরে নিয়ে গেছে। পরে শুনেছি তাকে মেরে ফেলে লাশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। শিশু সন্তান ফায়সাল (৫), রাশেদ (৩) ও আনোয়ার (২) এই তিন সন্তানকে নিয়ে কোন রকমে পালিয়ে এসেছি। খেয়ারীপাড়ার আব্দুল হামিদ (২৬) জানায়, ঘরে আগুন দিয়ে পুড়ে দেয়ার সময় তার চোখের সামনে বয়োবৃদ্ধ পিতা শফিউল্লাহ (৫৫) মারা যান। উপায়ন্তর না দেখে বাবার লাশ ফেলে মাকে নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছি। নাগপুরা থেকে পালিয়ে আসা আব্দুল গফুর (৪০) জানায়, গত এক সপ্তাহ ধরে মগসেনারা সীমান্তের ঢেকিবনিয়া, কুমিরখালী, শিলখালী, বলিবাজার ও নাগপুরাসহ ২০টি গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। এখনো গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছে। বয়োবৃদ্ধ মরিয়ম খাতুন (৫৫) জানায়, তার ছেলে ইমাম শরীফ (২৮) ও তার পুত্রবধূ মনোয়ারা (২২) ৩ জনের সংসার তছনছ করে দিয়েছে মগসেনারা। এভাবেই অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গাদের বর্ণনায় ভারি হয়ে উঠেছে সীমান্ত এলাকার পরিবেশ। প্রতিদিনই আসছে রোহিঙ্গার স্রোত।

print