FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

৯ জানুয়ারি, ২০১৬ - ৫:৪০ অপরাহ্ণ

সেলিনা হোসেনের ধারাবাহিক উপন্যাস – নবম কিস্তি

salina

x

salinaসাহিত্য ডেস্ক : খোলা দরজা বন্ধ করার কথা ভাবতেই দেখি সুষমা এসে দাঁড়িয়েছে। দুই হাতে ব্যাগ। ও এভাবে ব্যাগ ভর্তি খাবার আনে আমার জন্য। আমার পছন্দের খাবার। আমি ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বলি, আয়। ভালো আছিস।
তোমার কথা ভাবলে আমার ভালোলাগা অন্যরকম হয়ে যায় ভাইয়া। আমাদের সাত ভাইবোনের মধ্যে তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয়। সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি তোমার গান। তুমি যেভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাও সেটা তোমার খুবই নিজস্ব ভাইয়া। অন্যদের ধারেকাছে যায় না।
এবার থাম সুষমা। কি এনেছিস দেখা।
প্রশংসা করলাম বলে লজ্জা পেলে? তোমার লাজুক ভাবটা আর আর গেলো না। ভাবির সঙ্গে তোমার কি করে যে প্রেম হয়েছিল আমি বুঝতে পারি না।
থাম, থাম সুষমা। তুই এলেই বাড়ির পরিবেশটা প্রাণ পায়। তুই কথা না বললেও সেটা হয়।

সুষমা হাসিতে ভেঙে পড়ে বলে, আমাকে তুমি একটি নতুন নামে ডাকলে বলো। নিজের জন্য কোনো নাম ঠিক করেছ কি? তোমার সঙ্গে এটা আমার মজার খেলা। কোনো নাম ঠিক করে থাকলে বলো।
কয়েকদিন তুই আমাকে তেনজিং নোরগে ডাকবি।
তেনজিংতো হিমালয়ের চুড়োয় ওঠা প্রথম নেপালি।
হ্যাঁ তাই। নাসার বিজ্ঞানীরা প্লুটো গ্রহে যে পর্বত দেখতে পেয়েছে তার নাম রেখেছে তেনজিং নোরগে।
খবরটা আমি পত্রিকায় পড়েছি তেনজিং দাদা।
আমরা দুজনে হাসতে হাসতে সময় ভরে ফেলি।

সুষমা ডাইনিং টেবিলের উপর ব্যাগ রেখে খাবারগুলো বের করে। যেগুলো লাঞ্চে খাব তা টেবিলে রেখে বাকিগুলো ফ্রিজে ঢুকিয়ে দেয়।
ভাবি কেমন আছে ভাইয়া?
তার আবার থাকা কি? যেমন থাকার তেমনই আছে। সকালে বিছানা বদলে দিয়েছি।
এখনও তুমি ভাবিকে নদী ডাক?
হ্যাঁ, ডাকি। নদীর নাম ধরেই ডাকি। এই ডাকতো শুধু ভালোবাসার মানুষকে খোঁজ নয়, নিজেকেও খোঁজা। দেখিস না তোকে বলি আমার পছন্দের একটি শব্দে ডাকতে, কিংবা অন্য কোনো নামে। আগে ডালিয়াকে বলতাম। এখন তুই আমার কাছের মানুষ সুষমা।
তুমি নিজেকে নিয়ে নতুন করে কাউকে ভাবো না কেন ভাইয়া? যেভাবে দিন কাটাও তা দেখে আমার খুব কষ্ট হয়। মানুষ কি এভাবে বেঁচে থাকতে পারে।
আমি হাঁ করে ওকে দেখি। তাকিয়েই থাকি। ও প্রায়ই এমন কথা বলে। আমিতো জানি ডালিয়ার মুমূর্ষ শরীর সামনে রেখে এমন কথা কখনোই ভাববো না। তাহলে কি ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হলে থামবো!
তাকিয়ে আছ কেন ভাইয়া? কিছু ভাবছ?
তুই এমন কথা প্রায়ই বলিস।
তুমি আর কতকাল এভাবে থাকবে? পথ থেকে ডেকে আনা মানুষেরা তোমার ঘর দেখছে। তুমি নিজে দেখছ। আমি এলে আমার বুক ফেটে যায়।
তুইতো জানিস অচেতন ডালিয়াকে আমি এখনও নদীর নামে ডাকি। যতদিন দম ফুরিয়ে না যাবে ততদিন ডাকতেই থাকব রে।
জানি। তারপরও জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়। কেন হয় তা আমি জানি না। হয়তো তোমার কাছ থেকে শুনতে ভালোলাগে সেজন্য।

আজকে ভাবি তোমার কাছে কোন নদী?
বিপাশা। ভারতের মহারাষ্ট্রের এই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা। আমরা পুনেতে নিয়েছিলাম রাজমোহন গান্ধী আয়োজিত একটি সম্মেলনে। সেখান থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়েছিল নদীর ধারের রাস্তা দিয়ে। চমৎকার দিন ছিল। নদী দেখে ডালিয়াতো মহাখুশি। বলল, আমি এই নদীর ধারে একটুক্ষণ দাঁড়াতে চাই। ওর অনুরোধে গাড়ি থামিয়েছিল ড্রাইভার। ডালিয়া নিজেই বলেছিল, আমি তোমার বিপাশা হতে চাই। কি যে চমৎকার নদী ছিল সেটি।
সুষমা হাসতে হাসতে বলে, সেই থেকে ভাবি তোমার বিপাশা। বেশ। তোমার দিনগুলো খুব সুন্দর ছিল ভাইয়া। এখন আর এসব কথা শুনব না। তোমার কষ্ট বাড়বে।
তোর সঙ্গে কথা বললে আমার কষ্ট হয় না। আমি এনজয় করি। তুই ডালিয়াকে অনেক ভালো বুঝিস।
এসব কথা থাক ভাইয়া। আমি ভাবিকে স্যুপ খাইয়ে আসি। তুমি গোসল করে নাও। বুয়া আর জুয়েল বাজারগুলো গোছাচ্ছে দেখলাম।
হ্যাঁ, আজ ওরা আমাকে বেশি সময় দিয়েছে। ওরাইতো আমার দিনগুলো ঠিকঠাক রাখছে। আর আমার ভালোলাগার খাওয়া-দাওয়া সামলাচ্ছিস তুই সুষমা।
এ আর কতটুকু। পারলে আরও বেশি করতাম। সময় পাইনা। অফিসে মেলা ঝামেলা। প্রায় প্রতিদিনই অফিস থেকে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে ছুটির দিনেও যেতে হয়। আরেকটা কথা কি জানো ভাইয়া কাজের প্রতি মনোযোগী হলে অন্যরা সুযোগ নেয়। মনে করে অমুকেইতো আছে, আমার না থাকলেও চলে।

প্রমোশন পেয়ে তোর কাজের দায়িত্বও বেড়েছে না রে? আমি, আরিফুর রহমান ছোট বোনটির দিকে গভীর স্নেহে তাকাই, যেন ওর শৈশব দেখতে পাচ্ছি যখন বোনটি কোনো কারণে কেঁদে বুক ভাসাতো, চোখমুখ জুড়ে গড়াতে থাকত অশ্রুজল আর হাঁ করে কান্নার ভঙ্গি চেহারাটাকে অন্যরকম করে ফেলত। তখন আমি বলতাম, তোকে পরির মতো লাগছে। নাকি পেত্মীর মতো? বলতো কোনটা তুই? ও হঠাৎ করে কান্না থামিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত।
সুষমা ভাইয়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে থমকে যায় প্রথমে, ভাবে ভাই তার অন্যকিছু ভাবছে। হয়তো ওকে নিয়ে কিংবা আর কাউকে। তারপরও মিনমিনিয়ে বলে, হ্যাঁ, তাতো বেড়েছে। সুষমা মৃদু হাসে। ভীষণ মিষ্টি লাগে ওর হাসি। ভারী স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে ওকে। ওর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে চোখ নামাই আমি। ওকে আর দেখতে চাই না। পঁয়তাল্লিশের মতো বয়স হয়েছে ওর। স্নিগ্ধতার রেশ মুখজুড়ে জলজল করে এখনও। মবিনের চোখে ওর সৌন্দর্যের কোনোকিছুই ধরা পড়েনি। বিয়ের শুরুর দিনগুলো থেকে কতদিন তাদের আনন্দে কেটেছে সে কথাটিও স্বীকার করতে চায়না মবিন। সুষমার একমাত্র অপরাধ ওর কোনো সন্তান হবে না। ডাক্তারি পরীক্ষায় এটাই ধরা পড়েছে। দু’বছর আগে ওদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। একদিন সুষমা আমাকে বলেছিল, আমার সঙ্গে মবিনের বিবাহিত জীবনের পুরো সময়টাই নাকি জিরো। ও কিছুই পায়নি। মানুষের এই মিথ্যাচারের কোনো সংজ্ঞা আছে ভাইয়া?

সংজ্ঞা থাকা না থাকা আমার কাছে মূল্যহীন। যে ব্যক্তির সততা নেই তাকে মূল্যায়ন করতে চাই না রে বোন। ও নিজেই আমার কাছে জিরো মানুষ।
আমার কাছে ও কোনোদিন জিরো হবে না। ওকে আমি ভালোবাসি ভাইয়া, এখনও বাসি। ও সন্তান পাওয়ার জন্য আর একটি বিয়ে করেছে তারপরও ভালোবাসি।
সুষমা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলে, আমার বেতনের টাকার একটা বড় অংশ ওর জন্য ব্যয় করেছি। ওর ফ্যামিলির দু’টো ছেলের পড়ার খরচ দিয়েছি। সংসারের খাবার খরচ এক মাস ও দিত, আর এক মাসে আমি। ও আমার সঙ্গে হিসেব করেই চলেছে। হিসেবের বাইরে ওর আবেগের জায়গা আমি কমই দেখেছি।
এসবতো আমি জানি সুষমা। তুই আমাকে অনেক বার বলেছিস। তোর চোখের জল আর ঝরবেনা এমন একটি জায়গা নিজের জন্য বানাতে হবে তোকে সুষমা। দীর্ঘজীবন পথের এখনও অনেক বাকী।

আমি এতকিছু করার পরও আমাদের জীবনের আট বছর শূন্য হয়ে গেল কেন? সন্তানের জন্মই কি সব? জীবনের আর সবদিক শূন্য? এটা কোনো জীবন-দর্শন নয় ভাইয়া। শূন্যতাকে জয় করাই জীবন। এটা যারা বোঝেনা তাদের প্রতি করুণা করলেও নিজেকে বঞ্চিত করা হয়। আমি এখন সেই বঞ্চনার মহাসমুদ্র পাড়ি দিচ্ছি।
আমি জানি তুই কূলে পৌঁছাবি। পৌঁছাতেই তোকে হবে সুষমা। আমি ওর মাথায় হাত রাখি।
সুষমা আবার চোখে আঁচল চাপা দেয়। কান্নার মৃদু শব্দ আসে। আমার কাছে এলেই ও নিজেকে উজাড় করে। একটি কথা অনেকবার বলেছে, আজও বলছে। হয়তো আরও বলবে। বলেই নিজেকে উজাড় করবে। বুঝতে পারি একেই বলে দুঃখ ভাগ করে নেয়া। আমি ওর মাথায় হাত রেখে বলি, সুষমা থাম। তোকে এভাবে দেখতে চাই না। তুই মেধাবী মেয়ে। আমি চাই তোর জীবনে নতুন ফুল ফুটুক। জীবনকে উপভোগের সময় ফুরিয়ে যায়নি। ও চোখ মোছে। স্যুপের বাটি গুছিয়ে ডালিয়ার কাছে যায়। নেইলা বুয়া খানিকটুকু দূরে দাঁড়িয়ে সুষমাকে দেখে। আস্তে করে বলে, খালার দুঃখু আমার চাইতেও বেশি। আমার ভাত কম, খালার ভাত বেশি। আমার জরায়ুতে ফুল ফুটছে, খালার জরায়ুতে ফুল ফোডে নাই। হায় রে মাবুদ।
ঠিক আছে, তুমি বাড়ি যাও বুয়া। তোমার কথা শুনলে ও দুঃখ পাবে। আমি চাইনা যে ও অনবরত দুঃখ পাক।

আপনে আমারে তাড়ান ক্যান খালু? আর একজনের দুঃখু দেইখলে আমার মন পোড়ে। আমিওতো পরের দুঃখ বুঝি খালু। প্যাডে ভাত নাইতো কি হইছে, মনে তো বল আছে।
সুষমার দুঃখ তুমি বুঝবে না।
ক্যান, বুঝুম না, বুঝিতো। তার পোলাপান নাই। আমারতো পোলাপান আছে।
তুমি অনেক ভাগ্যবতী। অনেক সাহসী। তোমাদের জন্যইতো আমরাও বেঁচে আছি নেইলা বুয়া।
হ, তাইতো। আমার ভাইগ্যতো অনেক ভালা। আমি ক্যান ভাইগ্য খুঁজমু। আমার কপালে ভাইগ্য জমা আছে। ওহ, আল্লাহরে, বাড়ি যাই। চাইল-ডাইল কিনা বাড়ি গিয়া আইজ খিচুড়ি রাঁধুম। আল্লাহ, আমারে হাজার বছর আয়ু দিব। ওই জুয়েল, তুই যাবি?
আপনি যান, আমি পরে যাব। আমার কাম আছে। স্যারের পড়ার ঘরটা গোছায়ে দিব।
আইচ্ছা থাক তুই। আমাগো কপাল ভালা যে স্যারের মতো মানুষ পাইছিলাম। বেরিয়ে যায় নেইলা বুয়া। আজ ওর মন ভালো নেই। বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজাটা বন্ধ করে না। ওর হাঁটার মধ্যে অন্যমনস্ক ভঙ্গি। জুয়েল দরজা লাগাতে গিয়ে খেয়াল করে নেইলা বুয়া এক পা এক পা করে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। একটু পরে কান্নার শব্দ শুনতে পায়। বুঝতে পারে না যে তার কি হয়েছে, ও মাথা না ঘামিয়ে শব্দ না করে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর রান্নাঘরে ঢুকে।
আমি ড্রইংরুমে বসে জুয়েলকে খেয়াল করি। আমি জানি আজ ওর একটি বিশেষ দিন। সুষমাকে দেখলে জুয়েল সেদিন বাসা থেকে নড়ে না। সুষমার আনা খাবারের জন্য বসে থাকে। আমি ওকে এই প্রশ্রয় দিয়ে থাকি। একটু ভালো খাবারের জন্য ওর বসে থাকা আমাকে নাড়িয়ে দেয়। যে ছেলেটির কাছে নিজের ধর্মের পরিচয় নেই তার কি নিজের পরিচয় খুঁজে ফেরা কোনোদিন ফুরোয়? নাকি ও এসবের ধার ধারে না? ও কেন বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজবে, বেঁচে থাকা যার কাছে নিরন্তর লড়াই। তার কি নিজেকে খোঁজার সময় আছে? ওকে কেন আমি ঠিকমতো মূল্যায়ন করছি না? ওর নিজের চিন্তার ভুবন আছে, সেখানে ওর খেলাঘর আছে। খুনসুটির সুযোগ আছে। ও এক প্রাণবন্ত তরুণ। ওকে আমার বুঝতে হবে। আমি ওর অনেক কিছুই জানি না। কতটা জানলে একজন মানুষকে বোঝ হয় সে পরিমাপ আমার নেই। যেটুকু জানি তা দিয়ে ওর তল ছোঁয়ার সাধ্য আমার নেই। ওকে আমি আক্ষেপ করতে দেখি না। জীবনের বাজী ধরার লড়াইয়ে ও এগিয়ে আছে। আমি শুধু এটুকু বুঝি যে কোনো বাজী ধরে ও হারে নি। রাস্তার ধারে বসে যে ছেলে ছেঁড়া জুতো সেলাই করে তাকে আমি মমতার একটি জায়গা দিতে পারি। দেয়া উচিত বলে মনেও করি। আমি তো এটুকুই ওর জন্য করেছি। এর বেশি কিছু নয়। ও কাজ করে মাসিক বেতন পায়। ধার চাইলে দেই, ও শোধ করে দেয়। কখনো বলে না স্যার টাকাটা ফেরত না দিলে কি হয়? বাবার অসুখ, অনেক খরচ হয়েছে স্যার কামাই করতে পারিনি। রাস্তার পাশে না বসলে তো রোজগার হয় না। না ও কোনো অজুহাত দেখায় না। এই মুহূর্তে ওর দিকে তাকিয়ে আমি বিব্রত বোধ করি। নিজেকে সংশোধন করার কথা চিন্তা করি। তখন ও কাছে এসে দাঁড়ায়। আস্তে করে ডাকে, স্যার।

কিরে কিছু বলবি? আমি পূর্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাই। আমি তো জানি ও একটি হ্যান্ডসাম ছেলে। ওকে নতুন করে দেখার কিছু নাই। ওর বিকাশ সম্পূর্ণ হয়েছে।
ও ইতস্তত করে বলে, রাস্তার ধারে আমি যখন পড়েছিলাম তখন খালামণি কেন আমাকে কুড়িয়ে পায়নি? আমি কি খালামণির বাচ্চার শখ মেটাতে পারতাম না? নাকি খালু আমাকে মানতো না। বলতো রাস্তার ছেলের মধ্যে আমি নিজের সন্তানের ছায়া দেখি না। একটুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, আমি কি খালামনির ছেলে হতে পারতাম না স্যার?
পারতি। খুব পারতি। আমি উত্তেজিত স্বরে বলি। বাঁকা করে রাখা শরীর সোজা করি। ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলি, আয় আমার হাত ধর। ও সামনে এগিয়ে আসে না। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। আমি থমকে থাকি। মনে হয় সুষমাকে বলি, সুষমা তুই জুয়েলকে নিয়ে বাড়ি যা। কিন্তু আমি জানি তা হবে না। জুয়েল যে পরিবারে আছে সেটাই ওর আপন পরিবার। ওখান থেকে ও কোনোদিনই বেরিয়ে আসবে না।
ও আবার ডাকে, স্যার। আপনি কি আমার কথা শুনতে পেয়েছেন?
আমি ওর দিকে তাকালে বলে, স্যার খালামণি কি বেলিকে বাড়িতে নিয়ে যাবে? ওর অনেক কষ্ট। সংসারের সব কথাও আমাকে বলে। বলে, একদিন সংসার থেকে পালিয়ে রেললাইনের উপরে গিয়ে শুয়ে থাকবে। ট্রেনটা যখন কুউ-ঝিক-ঝিক করতে করতে চলে যাবে তখন ও চোখ বুঁজে কুউ-ঝিক-ঝিক গানের মতো গাইবে। মনে করবে ও পরির দেশে যাচ্ছে।

আমি হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। চেঁচিয়ে বলি, এসব কথা ও বলতে শিখেছে? ওতো এখনো এসব ভাবনার জন্য বড় হয়নি জুয়েল।
আপনি কি বলছেন স্যার, ও অনেক বড় হয়েছে। পাক্কু বুড়ি হয়েছে। অনেক কিছু শিখেছে। শিখবে না কেন স্যার? রাস্তাঘাটে থাকলে এসব কথা তাড়াতাড়ি শেখা হয়ে যায়। এসব শিখতে একদিনও সময় লাগে না স্যার।
তুইও কি এসব কথা শিখেছিস জুয়েল?
আমিতো কবেই শিখেছি স্যার। বেলিরতো বাবা-মা আছে। আমিতো বেজম্মা। আমার শিখাতো ওর আগেই হবে। আমিতো ওর চেয়ে অনেক বড়।
খবরদার নিজেকে বেজম্মা বলবি না। তোর মুখে এমন কথা আমি একদম শুনতে চাই না। জানিস না আমি তোকে কত ভালোবাসি। তাছাড়া তোর পালক বাবা-মা আছে না?
আছে। জুয়েল অন্যদিকে মুখ ফেরায়। ওর চোখ ছলছল করে।
ওরা তোকে সন্তানের মতো আদর দিয়েছে না?
তাদের আদর-যত্ম পেয়েছি বলেইতো আমি জুয়েল হয়েছি। তারা আমার ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়নি। তাদের ধর্ম পর্যন্ত না। বলেনি, তুই আমার ধর্ম নিয়ে বড় হবি। কিংবা না বললেও পারত যে তুই আমার ধর্মের সন্তান না। আমার সঙ্গে সত্যি কথা বলেছে। সত্য বলেই আমাকে মানুষ করেছে। নইলে আমি অমানুষ হতাম। একটা সন্ত্রাসীতো হয়েই যেতাম।

ওর কথা শুনে আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরি। ওর চোখের পানি মুছিয়ে দেই। নিজেরও চোখ মুছি। বলি, তোর জন্য আমার দরজা সবসময় খোলা থাকবে রে। মনে করবি এটাও তার বড় ঠাঁই।
ও আমার কাছ থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলে, আপনিও আমার বাবা। আপনি আমাকে ভালোবাসেন। আপনি আমাকে কাজের দরকারে ঘরে ডেকে এনেছেন। তা না হলে এমন ঘরের যত্ম আমার দেখা হতো না। আমার ভাগ্য খুবই ভালো স্যার। আমার মনে কোনো দুঃখ নাই। যেটুকু দুঃখ আছে তাও চলে যায় যখন খালামণিকে কাঁদতে দেখি। আমিতো জানি খালামণি যখন আপনার জন্য খাবার আনেন, তখন আমার জন্যও আনেন। আমি না থাকলে আপনি আমার জন্য ফ্রিজে রেখে দেন। খালামণি কান্না কবে শেষ হবে স্যার? খালামণির কান্না দেখলে আমার বুক ভেঙে যায়। জুতো সেলাইয়ের কাজ না থাকলে তখন আমার কান্না পায়। আমি কাঁদি। দুই হাতে চোখের জল মুছি। ও আবার বলে, খালামণির কান্না কবে শেষ হবে স্যার?

আমি ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না। ও আমাকে কঠিন প্রশ্ন করেছে। সুষমা মা হতে পারবে না এটা যেমন সত্যি, তেমন সত্যি নয় যে ওর কান্না ফুরোবে না। ওর কান্না ফুরনোর চিন্তা ওকেই করতে হবে। আর কাউকে ভালোবেসে, তার থেকে ভালোবাসা পেয়ে, হাসি-আনন্দে জীবনের বাকি সময় ভরিয়ে নিজের কান্নার স্রোত ওকেই বন্ধ করতে হবে। আমার গভীর বিশ্বাস ও তা পারবে। তারপরও জুয়েলের প্রশ্নের জবাব আমি দেই না। চুপ করে থাকি। আমার বিরক্ত লাগে ভাবতে যে ও এখনও মবিনকে ভালোবাসার কথা বলে। এত ভালোবাসা নিয়ে ও নিঃস্ব হবে কীভাবে? দেখতে পাই ডালিয়ার নলের ভেতর স্যুপ দেয়া শেষ করে ও বেরিয়ে আসছে। জুয়েল দৌঁড়ে গিয়ে ওর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। (চলবে)

print