FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

১৪ নভেম্বর, ২০১৬ - ৫:৫৭ অপরাহ্ণ

সামাজিক মাধ্যমে অসামাজিক তাণ্ডব

image-47449-1479063635

x

সামাজিক মাধ্যমে অসামাজিক তাণ্ডব

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক গোলাম মাওলা রনি

ভদ্রমহিলার বয়স এখন তেপান্ন। আজ থেকে ঊনচল্লিশ বছর আগে তার যখন বিয়ে হয়েছিল তখন তার নাম ছিল জোলেখা আর বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ। আবহমান বাংলার নিতান্ত হতদরিদ্র পরিবারের কিশোরী জোলেখা দেখতে মোটেও সুন্দর ছিলেন না- বরং গায়ের কালো রঙ, বেঢপ মুখশ্রী এবং বেখাপ্পা লম্বা গড়নের জন্য গ্রামের লোকরা সারাক্ষণ আফসোস করে বলত- হায়! হায়! মেয়েটির কী হবে- শেষ পর্যন্ত বিয়ে-থা হবে তো। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে মেয়েটির বিয়ে হলো এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাজপুত্তরের মতো সুদর্শন এবং বিদেশি কোম্পানিতে চাকরিরত এক হাল ফ্যাশনের কেতাদুরস্ত যুবককে সে স্বামী হিসেবে লাভ করল। শহুরে যুবক কীসে কী বুঝলেন জানিনে কিন্তু প্রথম দর্শনেই জোলেখাকে অন্তর থেকে ভালবেসে ফেললেন।

বিয়ের পরপরই স্বামী জোলেখাকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। পল্লিবালার গেঁয়ো গেঁয়ো ভাব দূর করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা-তদবির করলেন। ভালো ভালো পোশাক-আশাক কিনে দেওয়ার পাশাপাশি ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। তার পর কোনো এক ভরা পূর্ণিমার জ্যোৎস্না প্লাবিত রাতে বাড়ির ছাদের ওপর কিশোরী স্ত্রীকে নিয়ে গল্প করার ফাঁকে স্বামী আবেগভরা কণ্ঠে জোলেখার হাত দু’খানা চেপে ধরে বললেন, এখন থেকে আর জোলেখা নয়Ñ তোমার নাম হবে জুলি। জোলেখারূপী জুলি বড় বড় হিলযুক্ত জুতা পরে মাথার চুল ববকাট করে স্কার্ট পরার অভ্যাস করতে করতে কিশোরী থেকে যুবতী হতে হতে তার অতীতের দারিদ্র্য, গ্রামের সহজ সরল ভাব এবং নিজ সত্তাকে ভুলে গেলেন।

গোলাম মৌলা রনিজুলি স্বামীর চেষ্টায় এমএ পাস করে পিএইচডি পর্যন্ত করে ফেললেন। তার পর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিলেন। ইতোমধ্যে জুলির দুটো ফুটফুটে কন্যাসন্তান হলো এবং তার স্বামীর অর্থনৈতিক অবস্থা আগের তুলনায় আরও অনেক উন্নতি হলো। স্বামী প্রবর রাজধানীতে একাধিক বাড়ি-গাড়ি ক্রয় করলেন এবং বিশাল অঙ্কের নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা করলেন। স্ত্রীর প্রতি তার বিশ্বাস, ভালবাসা আগের তুলনায় আরও বেড়ে গেল। তিনি তার সমুদয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং নগদ অর্থ স্ত্রীকে দান করলেন। জুলির বয়স যখন পঞ্চাশ বছর তখন তার বড় মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ শ্রেণিতে পড়ছিল। মূলত মেয়ের কাছ থেকেই তিনি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ট্যাংগো ইত্যাদি সামাজিক মাধ্যম সম্পর্কে অবগত ও আসক্ত হন এবং হাতে-কলমে শিক্ষা লাভ করেন। মেয়ের কয়েকটি ছেলে বন্ধুর সঙ্গে জলির সখ্য গড়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যে একজনকে সে প্রেমিক হিসেবে গ্রহণ করে সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহার করে।

জুলির স্বামীর মনমানসিকতা একটু বেশি মাত্রায় আধুনিক এবং বাড়াবাড়ি পর্যায়ের উদারতায় পূর্ণ ছিল। তার বিগত যৌবনা কুৎসিত স্ত্রী নিজের মেয়ের ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্মার্টলি চলতে পারছে এ নিয়ে স্বামী বেচারার গর্বের অন্ত ছিল না। তার যাবতীয় গর্ব ধুলোয় মিশে গেল সেদিন যেদিন জুলি তার তরুণ প্রেমিককে ঘরে ডেকে আনলেন এবং স্বামীর মুখের ওপর তিন তালাক দিয়ে প্রেমিকের হাত ধরে চলে গেলেন। তরুণ প্রেমিক তার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে জুলির সাবেক স্বামীর জীবন বিষিয়ে তুলতে আরম্ভ করল। অন্যদিক জুলি তার সব সম্পত্তি করায়ত্ত করার পর সাবেক স্বামীর শেষ ঠিকানা অর্থাৎ বসবাসরত ফ্যাটটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য উকিল নোটিশ পাঠালেন এবং ঢাকার একটি আদালতে নারী নির্যাতনের মামলা ঠুকে দিলেন।

উপরোক্ত ঘটনাটি কোনো কল্পকাহিনি নয়। কেবল জুলি ও জোলেখা নামটি প্রতিষ্ঠা হিসেবে ব্যবহার করে আসা সাম্প্রতিক সময়ের পচে যাওয়া সমাজের একটি নষ্ট কাহিনির বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের নোংরা প্রভাবে আমাদের সমাজ-সংসার, ব্যক্তি ও পরিবারে কতটা নির্মমতা এবং বিকৃত রুচির অশ্লীলতা ঢুকে পড়েছে তা জুলির ঘটনার মধ্যে ফুটে উঠেছে। প্রায় বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছা এক নারী তার চল্লিশ বছরের দাম্পত্য জীবন, দুই যুবতী কন্যার ভূত-ভবিষ্যৎ এবং স্বামীর বিশ্বাস ও ভালবাসাকে অগ্নিকু-ে নিক্ষেপ করে নিজের সন্তানের বয়সী এক তরুণের হাত ধরে ঘর ছাড়তে পারেন এমনতরো ইতিহাস ফেসবুক আসার আগে আবহমান বাংলায় আদৌ ঘটেছিল কিনা তা আমার জানা নেই।

সামাজিক মাধ্যমে অসামাজিক কর্মকা-, সন্ত্রাস, অনাচার, ব্যভিচার, সন্ত্রাস ইত্যাদি এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যার কারণে অদ্ভুত ও জটিল সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, রাজাহানি, লুটপাট ইত্যাদি ফৌজদারি অপরাধের প্রকৃতি, কার্যকারণ, ধরন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। প্রচলিত আইন দ্বারা এসব অপরাধের তদন্ত এবং অপরাধীর শাস্তি প্রদান অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আত্মহত্যা, হুমকি প্রদান, মানহানিকর বক্তব্যের মাধ্যমে কারো জীবন-জীবিকাকে বিষিয়ে তোলা, নকলবাজি ইত্যাদি অপরাধ দিনকে দিন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। পরকীয়া, অশ্লীল যৌনাচার, সামাজিক ও ধর্মীয় অস্থিরতা সৃষ্টি এবং অন্যের ব্যবসা-বাণিজ্য, সুনাম-সমৃদ্ধির ক্ষতি, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন, পতিতাবৃত্তি ইত্যাদি অপরাধ সামাজিক মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে কলেরা, গুটিবসন্ত কিংবা প্লেগের জীবাণুর মতো মানববিধ্বংসী দানবে পরিণত হয়ে এত দ্রুত বিস্তার লাভ করছে যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো উপায়ই আমাদের জানা নেই।

ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একাংশ নিজেদের নাম-পরিচয় গোপন রেখে অদ্ভুত নাম এবং উপাধি ব্যবহার করেন। কেউ কেউ বয়স এবং লিঙ্গ পরিবর্তন করে নিজেকে উপস্থাপন করেন। ফলে আশি বছরের বৃদ্ধ যেমন সতেরো বছরের তরুণী পরিচয়ে নিজেকে পুরুষদের কাছে তুলে ধরেন, তেমনি অনেক বৃদ্ধা নিজেদের বাইশ বছরের জোয়ান পোলা সাজিয়ে মহিলাদের কাছে তুলে ধরেন। এটা এক ধরনের বিকৃত সমকামিতার নেশা যা এতকাল পশ্চিমা দেশগুলোয় ছিল এবং সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে এখন তা বাংলাদেশকে গ্রাস করেছে। কেউ কেউ আবার অসম প্রেমের আশায় নিজেদের বয়স গোপন করে অশ্লীল প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ছে। জুলির মতো বয়স্ক মহিলারা নিজেদের বয়স ও রূপ-যৌবন গোপন রেখে যুবক ছেলেদের, বিশেষ করে বখে যাওয়া নেশাখোরদের নিজেদের অর্থবিত্ত ও পদ-পদবি দ্বারা আকৃষ্ট করে কুকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বয়স্ক ও বিবাহিত পুুরুষরা অবিবাহিত তরুণী, অল্পবয়স্ক অথচ উচ্চাকাক্সক্ষী বিবাহিত নারীদের নিজেদের অর্থবিত্ত ও চতুরতার জালে বন্দি করে কুপথে টেনে আনছেন।

জুলির ঘটনাটি যেমন একশ্রেণির নারীর ভ্রষ্টতা ও বিপথগামিতার প্রমাণ বহন করে, তেমনি স্যামসান চৌধুরীর (কল্পিত নাম) ঘটনা থেকে হাল আমলের বয়স্ক পুরুষের প্রতারণা ও বিকৃত মানসিকতা সম্পর্কে যে কেউ ধারণা লাভ করতে পারেন। ভদ্রলোকের বর্তমান বয়স প্রায় ষাট বছর। বেশ বড়সড় ব্যবসায়ী। গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম। আদিকালে নাম ছিল সামছু। লোকজন সামু নামে ডাকত। সামুর বাব-চাচা, নানা-খালুদের বেশিরভাগই ২-৩টা বিয়ে-থা করে পুরো দশগ্রামের মধ্যে বেশ কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। আট-দশ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র সামুই লেখাপড়া করে ঢাকা আসতে পেরেছিলেন এবং নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে নিজেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। স্ত্রী করিমন এবং চারটি ছেলেমেয়ে নিয়ে তার জীবনটা ভালোই কাটছিল। ঘটনাপরিক্রমায় সামুর সামছু নামটি নিজের কাছে বিরক্তিকর বলে মনে হলো। অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সে গ্রামের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন এবং নিজের পিতৃ প্রদত্ত নামটি পরিবর্তন করে স্যামসান চৌধুরী নাম ধারণ করলেন।

স্যামসান চৌধুরী অর্থবিত্তের পেছনে ছুটতে গিয়ে বিগত জীবনে স্ত্রী করিমনের দিকে তাকানোর সুযোগ পাননি। তিনি যখন সময় ও সুযোগ পেলেন তখন করিমন রীতিমতো বিগত যৌবনা। এ অবস্থায় স্যামসান চৌধুরীর জীবনে দুটো ঘটনা ঘটল। প্রথমত, তিনি নতুনভাবে যৌবনপ্রাপ্ত হওয়ার ভান ধরলেন। দ্বিতীয়ত, বাপ-দাদা, চাচা-খালুদের মতো দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিয়ে করার খায়েসে পাগলপারা হয়ে উঠলেন। এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি কয়েকটি সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে জড়িয়ে ফেললেন। তার অর্থবিত্ত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশ-বিদেশের ভ্রমণের বহু আকর্ষণীয় ছবি সামাজিক মাধ্যমগুলোয় ছড়িয়ে দেওয়ার পর একশ্রেণির লোভী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া তরুণী স্যামসান চৌধুরীকে ঘিরে ধরল। শুরু হলো ভ্রষ্টাচার এবং অনৈতিক কর্মকা-। প্রথমে গোপনে তার পর প্রকাশ্যে। স্ত্রী করিমন বেগম প্রথমদিকে কিছুই বুঝলেন না। তার পর একদিন যখন সবকিছু টের পেলেন তখন নিজের অসহায়ত্ব ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ধর্মকর্মের অনুসরণ খুব বেশি মাত্রায় বাড়িয়ে দিলেন।

বয়স্ক মানুষদের নীতিভ্রষ্টতার বাইরে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের বাড়াবাড়ি দেশের অভিভাবকদের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের কিশোরী কন্যা তার ফেসবুক বন্ধুর আহ্বানে ঢাকা এসে গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এমনতরো শত শত নির্মম খবর প্রায়ই আমরা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে দেখি। অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে নেশা এবং অশ্লীল অসামাজিক কর্ম করার জন্য বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ গড়ে তুলেছে। রাজধানীসহ সারা দেশের বিনোদনকেন্দ্রÑ হোটেল, রেস্তোরাঁ, নির্জন পার্ক ইত্যাদি এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে কিংবা রাতবিরাতে যেসব ভয়ঙ্কর অসামাজিক ও অশ্লীল দৃশ্য সাধারণ মানুষের নজরে পড়ে তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

অসামাজিক কর্মকা-ের অসংখ্য বাণিজ্যিক প্লাটফর্মও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে গড়ে উঠেছে। টাকার বিনিময়ে সব বয়সের নারী-পুরুষ এবং হিজড়া সরবরাহের যেসব অশ্লীল বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় পৃথিবীর অন্য কোথাও হয় কিনা তা আমার জানা নেই। এসবের বাইরে রয়েছে ভয়ঙ্কর সব সাইবার ক্রাইম গ্রুপ। তারা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় যে কোনো নাগরিককে ফলো করে এবং সময় ও সুযোগমতো তাকে জিম্মি করে সবকিছু হাতিয়ে নেয়। এই গ্রুপটি ভাড়াটিয়া খুনি, অপহরণকারী অথবা গুমকারী হিসেবেও কাজ করে থাকে। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত গোপন তথ্য-উপাত্ত হ্যাক করার জন্য একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এরা ব্যক্তিগত জীবনের নানা গোপন কা–কারখানা, ব্যাংক হিসাব, ক্রেডিট কার্ড এবং ছেলেমেয়েদের তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জিম্মি করে ফেলে এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকা- করে বেড়ায়।

জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট, রাষ্ট্রবিরোধী ও সরকারবিরোধী কর্মকা- এবং নাশকতামূলক কর্মকা-ের জন্য অপরাধীরা যেভাবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছে তাতে ব্যক্তি, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনকে ছাপিয়ে স্বয়ং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি হুমকির মুখে পড়ে গেছে। দেশের প্রায় তিন কোটি লোক সরাসরি সামাজিক মাধ্যমের সঙ্গে সংযুক্ত। দেশের কোনো টেলিভিশনের দর্শক সংখ্যা সর্বোচ্চ দশ লাখের বেশি নয়। টেলিভিশনের এমন সব অনুষ্ঠান রয়েছে যা দশ হাজার মানুষও দেখে না। দেশের সবগুলো জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্মিলিত প্রচার সংখ্যা দশ লাখের বেশি হবে না, অন্যদিকে সারা দেশের পত্রপত্রিকার পাঠকসংখ্যা সর্বোচ্চ লাখপঞ্চাশেক হতে পারে। পত্রিকার এ-মাথা থেকে ও-মাথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন অথবা দৈনিক এক ঘণ্টা পত্রিকা পড়ার পেছনে খরচ করা লোকের সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি হবে না।

উপরোক্ত তথ্যের সঙ্গে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের তুলনা করলে যে কেউ সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন বর্তমানকালের বাস্তব অবস্থা। তিন কোটি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীর মধ্যে অন্তত পঞ্চাশ লাখ মানুষ রয়েছেন যারা দৈনিক পাঁচ ঘণ্টারও অধিক সময় সামাজিক মাধ্যমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। দৈনিক গড়ে এক ঘণ্টা ব্যবহারকারীদের সংখ্যা এক কোটির ওপরে। সামাজিক মাধ্যমে সম্পৃক্ত রয়েছেন অথচ দৈনিক একবারের জন্যও ঢুঁ মারেন না এমন লোকের সংখ্যা মাত্র এক কোটি। কাজেই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সামাজিক মাধ্যমের সামাজিকতা এবং অসামাজিকতার তা-ব কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তা বোঝার জন্য খুব বেশি জ্ঞান-গরিমার দরকার নেই।

সামাজিক মাধ্যমগুলোর অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে যা নিয়ে আগামী দিনে সুযোগ পেলে স্বতন্ত্র একটি নিবন্ধ লেখার চেষ্টা করব। আমাদের জাতীয় চরিত্র, ভঙ্গুর সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, নৈতিক অবক্ষয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির সঙ্গে আইনের শাসনের অনুপস্থিতির কারণে আমরা সামাজিক মাধ্যমগুলোর ইতিবাচক দিকগুলোকে আমলে নেয়ার পরিবর্তে মন্দ দিকগুলোর দ্বারা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি এবং ধ্বংসের অতলান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি কোনোরকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই।

print