FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

২১ অক্টোবর, ২০১৫ - ১১:৩৯ অপরাহ্ণ

মহিলা মার্কেটে দোকান করে স্বাবলম্বী হচ্ছে-তিস্তা পাড়ের হতদরিদ্র নারীরা

x

tista-2-dokan-1মহিনুল ইসলাম সুজন নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি ঃ তিস্তার পাড়ের হতদরিদ্র নারীরা পুরুষের পাশাপাশি মহিলা মাকের্টে ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। এক সময় নারীরা সংসারের বোঝা হলেও এখন তারা বাজারে দোকান করে হয়ে উঠছে সাবলম্বী। এসব হতদরিদ্র নারীরা স্বপ্ন দেখে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে নিজের সংসার, সন্তানদের জন্য ও নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজের ইচ্ছেমত কেনাকাটা করবে, পরিবার করে তুলবে আত্বনির্ভরশীল।
কিন্তু তারা তাদের স্বপ্নগুলো এক সময় বাস্তবায়ন করতে পারতেন না। কারন তখন পরিবারের পুরুষের উপর নির্ভরশীল। পরিবারের পুরুষদের ইচ্ছে অনুযায়ী তাদেরকে চলতে হত। তাছাড়া পরিবারের একজনের আয়ের উপর তাদের মৌলিক চাহিদা পুরন করা সম্ভব হত না। সেখানে তাদের স্বপ্ন পূরন করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। তখন তাদের মনের সাজানো স্বপ্নগুলো শুধু স্বপ্নই থেকে যায়।আত্নবিশ্বাসী করে রুপান্তরিত নেতৃত্ব তৈরী ও নারী নেতৃত্ব দৃশ্যমান করার লক্ষে অর্থায়নে পল্লীশ্রী এলএইচডিপি প্রকল্পটি তিস্তার পাড়ের হতদরিদ্র নারীদের নিয়ে কাজ শুরু করে। দরিদ্র নারীরা তাদের সিবিওতে যখন সামাজিক মানচিত্র তৈরী করেছিল তখন এলাকার স্থায়ী কিছু সম্পদের মধ্যে কলোনী বাজারের মহিলা মার্কেটটিকে তাদের মানচিত্রে নিয়ে আসে।
কিন্তু এই মার্কেটটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। এমন সময় নারী নেতাদের সাথে কলোনী বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির মধ্যে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। পূর্ব ছাতনাই ইউপি চেয়ারম্যান প্রভাষক আব্দুল লতিফ খান বলেন, মহিলা মার্কেটে দোকান করার মত কোন নারী উদ্যোক্তা না থাকায় মার্কেটটি যখন চালু করা হয়নি।
কিন্তু এখন অনেক সদস্যই মহিলা মার্কেটে দোকান করতে আগ্রহী। তাই আগ্রহীদের তালিকা তৈরী করা হয় এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলা হয়। পরিবারের সদস্যদের মার্কেটে ব্যবসা করার সুবিধা বুঝালে তারা মহিলা মার্কেটে দোকান নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। মহিলা মার্কেটে দোকান করার ৩৮টি আবেদন জমা পড়ে।
তার মধ্যে নারী ক্লাবের দলের নারী উদ্যোক্তা ৩৫জন, বাইরের ৩জন। বাজার কমিটি আবেদনপত্র যাচাই বাছাই করে ১৭টি আবেদন বৈধ করেন। মহিলা মাকের্টে দোকান ঘর ১২টি আবেদন করে ৩৮জন নারী উত্তোক্তা। নিরপেক্ষভাবে লটারির মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। দোকান বরাদ্দ পেয়ে নারী উদ্যোক্তাগন জানায় যে, আমরা অনেক খুশি কারন আমাদের বিভিন্ন ভাবে দোকান করার মত কোন নির্দিষ্ট জায়গা ছিল না। এখন আমাদের ব্যবসার একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরী হয়েছে।
আগে এ এলাকার কোন নারী বাজারে দোকান করত না আমরাই প্রথম নারী যারা বাজারে দোকান নিয়ে ব্যবসা করিতেছি। মহিলা মার্কেটে নারী উদ্যোক্তাগন বিভিন্ন ব্যবসার সাথে জড়িত। এদের মধ্যে সেলিনা বেগম (সেলিম ট্রের্ডাস সার, বীজ, কীটনাশক ), আরিফা বেগম (ইয়ামিন গার্মেন্টস), আলেয়া বেগম (আলেয়া মুড়িঘর), শিরিনা বেগম (শিরিনা ট্রের্ডার্স মসলা জাতীয়পন্য), নুপুর বেগম (নুপুর সেলাই ঘর কাপড়বিক্রি ও সেলাই), জয়নব বেগম (জয়নব ভ্যারাইটি ষ্টোর মুদির দোকান), হালিমা বেগম (হালিমা ট্রের্ডাস ইলেকক্টিস),আফেজা বেগম (আফেজা চাউল ঘর), লায়লা বেগম (লায়লা সবজি ঘর), ভারতী রানী (পাপড়ি সু ষ্টোর), লিপি বেগম (রানী টেলিকম এন্ড স্ট্রেশনারী কম্পিউটার), তসলিমা বেগম (তসলিমা ওয়াশিং ও লন্ডি ঘর)।
সদস্যগন উক্ত ব্যবসা পরিচালনার জন্য তারা নিজের তহবিল থেকে দোকান নেয়ার যাবতীয় খরচ ব্যয় করে এবং ব্যবসার ধরন অনুযায়ী পুজি বিনিয়োগ করে। বাজারে ব্যবসা করার মত তাদের যথেষ্ট পুজি না থাকায় তারা মহিলা মার্কেটের নামে একটি একাউন্ট করে সদস্যরা পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্পের কাছে অর্থ সহায়তার জন্য আবেদন করেন।
তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের সহায়তার ফান্ড থেকে মহিলা দোকানদারদের ব্যবসার ধরন বিবেচনা করে ১১জনকে দুই লক্ষ ষোল হাজার টাকা মহিলা মার্কেটের একাউন্টে চেকের মাধ্যমে প্রদান করে।
তসলিমা বেগমকে তার ব্যবসাটি সুষ্ঠভাবে পরিচালনার পাশাপাশি নারীদের পারিবারিক কাজের চাপ কমানোর জন্য উন্নত প্রযুক্তির ওয়াশিং মেশিন প্রদান করেন। ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার পুজি দিয়ে মালামাল ক্রয়ের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে পাইকারী মূল্যে মালামাল ক্রয় করছে এবং মার্কেটে তা বিক্রি করছে।
বাজারের মধ্যে তাদের দোকানে বেচাকেনা ভালই চলছে। এলাকার মানুষ আগ্রহী হয়ে কেনাকাটার জন্য মহিলা মার্কেটে আসছে। নারীরা মার্কেটে দোকান করতে আসলে তাদের পারিবারিক কাজের চাপ যেন না হয় সেজন্য পরিবারের স্বামীসহ অন্যান্য সদস্যরা পরিবারের রান্নাসহ যাবতীয় কাজ ভাগাভাগি করে এবং তাদের ব্যবসা করতে উৎসাহিত করে। নারীরা সহজেই দোকানে এসে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে।
মহিলা মার্কটের দোকানদাররা আশা করে যে, আজকে তারা পুরো বাজার মিলে মাত্র ১২জন নারী দোকান করছে। একদিন যেন বাজারের অধিকাংশ দোকানেই নারীরা দোকান পরিচালনা করে। কলোনী বাজারে নয় অন্যান্য বাজারের যে, মহিলা মার্কেট গুলো রয়েছে সেগুলো যেন নারী ব্যবসায়ীদের নামে বরাদ্দ দেওয়ার দাবী করে।
মহিলা মার্কেট পরিচালনার জন্য ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি রয়েছে। কমিটির সভা প্রধান ও সার ব্যবসায়ী দোকানদার সেলিনা বেগম জানায়, আমরা মহিলা মার্কেটটিকে একটি মডেল তৈরী করতে চাই। এখান থেকে দেখে যেন মানুষ বুঝতে পারে যে, নারীরা কোন ভাবেই দূবর্ল নয়, সুযোগ পেলে তারা অনেক ভাল কাজ করতে পারে।
নারী ক্লাবের মাধ্যমে আমরা যে তথ্য সম্বৃদ্ধ হয়ে আমাদের আত্নবিশ্বাস তৈরী হবে। আমরা পরিবারে ও সমাজে এখন সম্মান পাই, সিদ্ধান্ত দিতে পারি।
পূর্ব ছাতনাই ইউপি চেয়ারম্যান প্রভাষক আব্দুল লতিফ খান বলেন, মহিলা মার্কেটটি চালু করাতে পল্লীশ্রী যে ভূমিকা পালন করেছে তা প্রশংসনীয়। তিনি আরো বলেন মহিলা মার্কেটটি উন্নয়নের জন্য ভবিষ্যতে কমিটির মাধ্যমে মার্কেটের পাশে আরো নারীদের ব্যবসা করার জন্য দোকান তৈরি করে দিব।

print