FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

১৮ জুন, ২০১৫ - ৫:৫৫ অপরাহ্ণ

মরুময়তার পথে বাংলাদেশ

সম্পাদকীয়

x

সম্পাদকীয় কলাম :

উচ্চ তাপমাত্রা ও অনাবৃষ্টির কারণে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৮ হাজার ৭২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। মরুময়তা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালায় বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বিশিষ্টজনরা এ দাবি করেছেন। ১৭ জুন রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত কর্মশালাটির আয়োজন করে পরিবেশ অধিদফতর। অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দেশে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মরুময়তাও বাড়ছে। এরই মধ্যে দেশের এক-চতুর্থাংশ এলাকা মরুভূতিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১ কোটি ৫ লাখ হেক্টর জমি মরুভূমির কবলে পড়তে যাচ্ছে। আর এতে ৫০ লাখ হেক্টর জমি চাষের অনুপযোগী হয়েছে। দেশের ১৮ হাজার মাইল নদ-নদী শুকিয়ে ৮ হাজার মাইলে এসে ঠেকেছে।

অন্যদিকে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার ‘গ্রাভিটি রিকভারি এ্যান্ড ক্লাইমেট এক্সপেরিমেন্ট’ (গ্রেস) উপগ্রহের পাঠানো তথ্যের বুনিয়াদে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার লিখেছে— এবার কি স্পেনের মতো জাহাজে করে পানি আনতে হবে ভারতে? কিংবা পানির অভাবে সিরিয়ার মতো গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হবে ভারতে? ভাবছেন অলীক কল্পনা! না, মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার উপগ্রহের তথ্য কিন্তু তেমনই বলছে।

গ্রেস পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের পরিবর্তন হিসাব করে ভূগর্ভস্থ পানিস্তরের পরিবর্তন জানাতে পারে। নাসা জানাচ্ছে, ভারতের ক্ষেত্রে গ্রেসের ফলাফল সবচেয়ে উদ্বেগজনক। গ্রেস দেখাচ্ছে, উত্তর ভারতে ভূগর্ভস্থ পানিস্তর হ্রাসের হার পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। হরিয়ানা, পাঞ্জাব, রাজস্থান আর দিল্লিতে ২০০২ থেকে ২০০৮-এর মধ্যেই ১০৮ কিউবিক কিলোমিটার পানি হ্রাস পেয়েছে। মূল কারণ, সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার। পাম্পে দেদার পানি তুলে ফসল তো ফলছে, কিন্তু চরম সঙ্কটে পড়তে চলেছেন ১১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। শুধু পানিসঙ্কট নয়; কৃষি, শিল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন- প্রভাব পড়বে সবক্ষেত্রেই।

বিষয়টি প্রমাণ করতে ২০১২-এর জুলাইয়ের গ্রিড বিপর্যয়ে কিভাবে ভারতের বড় অংশ নিষ্প্রদীপ হয়ে গিয়েছিল সে উদাহরণ তুলে এনেছে পত্রিকাটি। খরার জন্যই নাকি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে গিয়েই এ বিপর্যয়।

১৯৯৫-২০০৯ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ খরা সামলাতে ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। ২০০৮ সালে স্পেনের ক্যাটালোনিয়া প্রদেশের পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, ফ্রান্স থেকে জাহাজে করে পানি আনতে হয়। স্পেনে ৭০ শতাংশ পানির ব্যবহার হয় কৃষিক্ষেত্রে। অপচয়ী সেচব্যবস্থা আর পানির ওপরে অতিরিক্ত নির্ভরশীল শস্যের জন্যই এই পরিস্থিতি বলে অনেকে মনে করছেন। আবার অনেকের মতে পানি অত্যন্ত সস্তা হওয়ায় অপচয় রোধ করা যাচ্ছে না।

লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলের পানিসঙ্কট সম্পর্কে বলা হয়েছে, গত ৮৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। জলাধারগুলোতে পানির স্তর দ্রুত কমছে। রয়েছে পানিদূষণের সমস্যাও। এখানে প্রায় চার কোটি মানুষ সঙ্কটে।

চীনের উন্নয়নের জোয়ারে টান পড়েছে পানির ভাণ্ডারে। বিশেষ সঙ্কটে চীনের উত্তরভাগ। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শহরের জলের চাহিদা মেটাতেই নাভিশ্বাস উঠছে। এভাবে চললে চীনের পানিসঙ্কট বড় আকার নেবে।

টাইগ্রিস, ইউফ্রেটিস, লালিত সভ্যতার পীঠস্থান মেসোপটেমিয়ায় পানিসঙ্কট তীব্র। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমার হারে সিরিয়া পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়। প্রথমে ভারত।

ভূমি নয়, তেল নয়, মাটির বুকের ভেতর বন্দী পানির জন্যই হতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ঢাকার কর্মশালায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় মরুময়তার জন্য কারণ হিসেবে উচ্চতাপমাত্রা ও অনাবৃষ্টিকে দায়ী করা হয়েছে। উজানে ভারতের নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ বা তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পানি না পাওয়ার কথা বলা হয়নি, বলা হয়নি দেশের ভূগর্ভস্থ পানি সেচের কথা। তাই যুদ্ধের প্রসঙ্গ এখানে অবান্তর। কিন্তু যেখানে বাঁচামরার প্রশ্ন, সেখানে শুধু দিবস পালন করার জন্য কিছু গতর বাঁচানো কথা বলে কি পার পাওয়া যাবে?

print