FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

১ জুন, ২০১৫ - ৬:৪৭ অপরাহ্ণ

বৃহন্নলা, বিবেক ও দ্য অ্যাডভেঞ্চারার চলচ্চিত্রের দর্শক কোথায় ?

Mamun

x

বিনোদন ডেস্ক : ‘নতুন চলচ্চিত্র, নতুন নির্মাতা’ চলচ্চিত্র উৎসবে মে মাসের সেশনে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্য থেকে তিনটি চলচ্চিত্র নিয়ে কিছু আলোচনা করতে চাই। চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে বা হয়েছে— এমনটা মনে হচ্ছে না। অথচ চলচ্চিত্রগুলো সচেতন মনোযোগ প্রত্যাশা করে। সেই অধিকার চলচ্চিত্রগুলোর হয়ে ওঠার মধ্যে আছে।

মুরাদ পারভেজের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বৃহন্নলা’, সাইফ সুমনের স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র ‘বিবেক’ ও রফিকুল আনোয়ার রাসেলের স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারার’ দর্শকদের আদর প্রাপ্য চলচ্চিত্র; অথচ আফসোস দর্শক এমনিতে নানা সময়ে হাপিত্যেশ করবেন ‘ভালো চলচ্চিত্র’ হচ্ছে না… ‘ভালো চলচ্চিত্র’ হচ্ছে না! কিন্তু তারা ভালো চলচ্চিত্র দেখার বা দেখতে যাওয়ার চেষ্টাও করবেন না বা করেন না! যদি ভালো চলচ্চিত্র দেখতে উৎসুক দর্শক সত্যিই চলচ্চিত্র দেখতে সিনেমা হলে যেতেন তাহলে মুরাদ পারভেজের ‘বৃহন্নলা’র খবর নিশ্চয়ই তাদের কাছে থাকত। কিন্তু তা সম্ভবত ঘটেনি। অধিকাংশ ‘ভালো চলচ্চিত্রের দর্শক’ ‘বৃহন্নলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র হয়েছে এবং সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়েছিল সেই খবরও রাখেননি।

আমার মনে আছে বেশ কয়েক বছর পূর্বে মুরাদ পারভেজের ‘চন্দ্রগ্রহণ’ চলচ্চিত্রটি দেখেছিলাম। সেটি তার প্রথম চলচ্চিত্র ছিল। তখন ‘চন্দ্রগ্রহণ’ দেখে তার চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি যত্ন, আন্তরিকতা চোখে লেগেছিল। মনে হয়েছিল বাহ! আরও একজন প্রতিশ্রুতিশীল নির্মাতার আবির্ভাব সম্ভব হয়েছে।

সে দিন (২৮ মে ২০১৫) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে মুরাদ পারভেজের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘বৃহন্নলা’ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছি। নির্মাণের নৈপুণ্যে কী সুন্দর সাবলিল দৃশ্যমালা! এত চরিত্র তবু সবার জন্য আলাদা যত্ন আছে, গুরুত্ব আছে। বিশেষ করে আজাদ আবুল কালামের অভিনীত ‘আরজ’ চরিত্রটি অপূর্ব। সম্ভবত এত নিখুঁত অভিনয় পাভেল ভাইয়ের কাছ থেকে খুব কম নির্মাতাই অর্জন করতে পেরেছেন। নির্মাতারাই যদি না জানেন তারা কী চান, তাহলে কিভাবে তারা আজাদ আবুল কালামের মত অভিনয় শিল্পীকে কাজে লাগাবেন? যেমন হুমায়ূন ফরীদিকে কাজে লাগানোর মত নির্মাতা পাওয়া গেল না; কিন্তু মুরাদ পারভেজ এখানে আজাদ আবুল কালামের ব্যাপারে সম্পূর্ণ সফল। তিনি ‘বৃহন্নলা’ চলচ্চিত্রে সবার কাছ থেকেই সহজ অভিনয় আদায় করেছেন। শুধু ফেরদৌসকে তিনি চলচ্চিত্রের গল্পের প্রয়োজনীয় মুডে অভ্যস্থ করতে পারেননি বলেই মনে হয়েছে। ফেরদৌস তার অভিনীত অন্যান্য চলচ্চিত্রে যেমন অভিনয় করেন তেমনটিই করেছেন এই চলচ্চিত্রেও… যা এক অর্থে মধ্যমমানের অভিনয়… চরিত্রের গুরুত্ব অনুযায়ী টেনশন তৈরিতে ব্যর্থ।

দেশের অন্যতম মেধাবী চলচ্চিত্রকার মুরাদ পারভেজের চলচ্চিত্র ‘বৃহন্নলা’ নিয়ে ভবিষ্যতে একটি বিস্তৃত লেখা তৈরির ইচ্ছে আছে। সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্রটি আরও দুই-একবার দেখতে হবে। তবে আজ যারা এই রচনা পড়ছেন তাদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যাই, কেন এই চলচ্চিত্রটির নাম ‘বৃহন্নলা’? চলচ্চিত্রটি দেখার সময় এই প্রশ্নটি বার বার মনে ঘুরঘুর করেছে। উত্তর একটি পেয়েছি বটে তবে তা এই পরিসরে নয়… ‘বৃহন্নলা’র জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত পরিসর… এই চলচ্চিত্র সেই দাবি রাখে ন্যায্যতার প্রশ্নে… শুধুমাত্র ‘বৃহন্নলা’র আলোচনার জন্য আজ তা তুলে রাখা গেল!

২.

একই দিনে আজাদ আবুল কালাম অভিনীত দুইটি ভালো চরিত্র দেখার অসুবিধে হল একটি অন্যটিকে ধাক্কা দেয়! এখানে ভালো বা কম-ভালোর বিষয় নয়… বিষয়টা সরাসরি ধাক্কা দেয়! সেখানে নির্মাতাদের সক্ষমতার প্রশ্ন আসে; প্রশ্ন আসে অভিনেতার আন্তরিকতার! এমনটা তো হতেই পারে কোনো একটি চরিত্র অভিনেতার মনের সাথে লাগসই হয়ে গেল; সেখানে তিনি হয়ত যে আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করবেন তা হয়ত অন্যটির বেলায় ওতখানি করবেন না! কিন্তু এটা খুব কম অভিনেতাই পারেন যার কাছে সবকটি বা সব ধরনের চরিত্রই সমান যত্ন বা গুরুত্ব পেয়ে থাকে। কেন যেন ‘বৃহন্নলা’ ও ‘বিবেক’ একই দিনে দেখে মনে হল আজাদ আবুল কালাম সমান আন্তরিকতা দিয়েই কাজ করেছেন অথবা বলা যেতে পারে করার চেষ্টা করেছেন। ‘বিবেক’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা সাইফ সুমন। এই ছবিটি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র ও নির্মাতার প্রথম চলচ্চিত্র। সরকারি অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৬ মিনিট। একজন সাধারণ মানুষের অভাবগ্রস্ত একটি রাত ও একটি ভোরের গল্প। ন্যায় ও অন্যায়ের টানাপোড়েন। লোভ ও লোভ থেকে উত্তরণের মানবিক লড়াই। সুন্দর। এই চলচ্চিত্রটির ব্যাপক প্রদর্শনী হওয়া প্রয়োজন। অথচ এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটির ভবিষৎ কী? সামান্য দুই-একটি সীমিত প্রদর্শনী! এত শ্রম, সময় ও প্রেম দিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পর নির্মাতা সাইফ সুমন যদি দর্শকের কাছে পৌঁছাতে না পারেন তাহলে তা দেশের ভালো চলচ্চিত্রের বিকাশে সক্রিয় সংগঠন এবং মানুষের তৎপরতাকেই কি প্রশ্নবিদ্ধ করে না? আমি আশা করি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলার চলচ্চিত্র সংসদ এই ধরনের চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীর আয়োজনে এগিয়ে আসবে। নির্মাতাদের পাশে এসে দাঁড়ানো খুব জরুরি। না হলে এই নির্মাতাদের পরবর্তী কাজ আর তৈরি হবে না। ‘ভালো চলচ্চিত্র’, ‘সুন্দর চলচ্চিত্র’ এ ধরনের কথা ফাঁকা বুলি মনে হবে। ‘বিবেক’ এর মত মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র কি খুব নিয়মিত নির্মিত হয় আমাদের দেশে? উত্তর না, হয় না।

৩.

রফিকুল আনোয়ার রাসেল নির্মাণ করেছেন স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারার’। পাহাড়ে, সমুদ্রে বিচরণকারী আমাদের তারুণ্য নিয়ে এই চলচ্চিত্র। একজন আহত পর্বতারোহীর হাসপাতালে নিয়ে আসা দিয়ে গল্প শুরু হয়। পরে সে গল্প বাঁক নেয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের তারুণ্যের দিকে। এই সময়ের তারুণ্যের ঝুঁকি নেয়াটা শখ অথচ একাত্তরে তা ছিল প্রয়োজন। প্রয়োজনে একজন ভীতু মানুষও হয়ে উঠতে পারে অসীম সাহসী। এই রকম একজন সাধারণ সিএনজি চালকের আড়ালে একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধার গল্প আমাদের বলেন রফিকুল আনোয়ার রাসেল।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হল, এই সময়ের তারুণ্যের দায়িত্ব আর একাত্তরের তারুণ্যের দায়িত্বের প্রশ্নে আমাদের খাবি খাওয়া অনুভূতিতে এই চলচ্চিত্র নাড়া দেয়। রোমাঞ্চের আবহে নির্মিত এই চলচ্চিত্র দেখার আনন্দ আছে… দেখতে দেখতে রোমাঞ্চের সাথে সাথে ইতিহাস চেতনায় রূপান্তরের বাঁক নির্মাতার চলচ্চিত্রিক সামর্থ্যকে অনুভব করায়… সহজেই এই চলচ্চিত্রের নাম আপনাকে একে প্রামাণ্যচলচ্চিত্র ভাবার মত ভুল করিয়ে নিতে পারে… কিন্তু নিঃসন্দেহে বলতে পারি ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারার’ নামের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র (দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ মিনিট) দেখতে বসে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আপনি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র দেখার স্বাদে ডুবে যাবেন!

আজকের আলোচনা শেষ করতে এসে কেবলি মনে হচ্ছে বাংলাদেশে ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে; দর্শকদের আদর পাচ্ছে না! এটা একা নির্মাতাদের দোষ নয়; সামগ্রিকভাবে যারা চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেন তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন তো সত্যিকার অর্থেই আপনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য মমতাবোধ করেন কী-না?

print