FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

২১ জুলাই, ২০১৭ - ১২:১১ অপরাহ্ণ

নিয়ন্ত্রণে নেই অাওয়ামী লীগের রাজনীতি – জেলায় জেলায় দ্বন্দ্ব-সংঘাত

আওয়ামীলীগ

x

 

রাজনীতি ডেস্ক:
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক জেলাগুলোয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত বেড়েই চলছে। ঢাকায় ডেকে এনে শাসিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এমপি, মন্ত্রী ও জেলা নেতাদের কোন্দল। এমপিত্ব টিকিয়ে রাখা, নতুনদের মনোনয়ন পেতে ছোটাছুটি, প্রবীণদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা চতুর্মুখী চাপ অনুভব করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসনে অনেকে সভানেত্রী শেখ হাসিনার শরণাপন্ন হয়েছেন। তবে কোন্দলপূর্ণ জেলা নেতাদের খুব শিগগিরই গণভবনে ডেকে দলের সভানেত্রীকে দিয়ে দ্বন্দ্ব নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে নীতিনির্ধারকদের কয়েকজন  জানান।

বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৭৮ সাংগঠনিক জেলার মধ্যে কমপক্ষে ৪০টি কোন্দলে জর্জরিত। এসব জেলায় মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে। গ্রুপিংয়ের কারণে খুনাখুনিও হয়েছে কয়েক জেলায়। প্রভাব-প্রতিপত্তিকে ঘিরেই এসব দ্বন্দ্ব বলে বিভিন্ন তথ্যে উঠে এসেছে। এসব চিহ্নিত জেলা নিয়ে চিন্তিত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। সাংগঠনিক বিরোধপূর্ণ জেলারগুলোর মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রাম মহানগর, চট্টগ্রাম দক্ষিণ ও উত্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কুমিল্লা উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, খুলনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, বরিশাল মহানগর, ভোলা, পিরোজপুর, মৌলভীবাজার, মাদারীপুর, সুনামগঞ্জসহ কমপক্ষে ৪০টি সাংগঠনিক জেলায় আওয়ামী লীগের তৃণমূল কোন্দল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

জানা যায়, মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় নেতাদের মধ্যে চলছে বয়কট ও পাল্টা-বয়কটের ঘোষণা। মারামারি, হানাহানি, সংঘাত ও সংঘর্ষের কারণে ক্ষমতাসীন দলটির অবস্থা এখন অনেকটা নাজুক। এ পরিস্থিতিতে বিরোধপূর্ণ জেলা ও থানা কমিটির নেতাদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করছেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের মধ্যে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। বর্তমানে এ দ্বন্দ্ব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিরোধের জেরে কিছুদিন আগে মহানগরের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী লালদীঘির মাঠে সমাবেশ করেন সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের বিরুদ্ধে। এ দুই প্রভাবশালী নেতার দ্বন্দ্ব নিরসনে ওবায়দুল কাদের নিজেই চট্টগ্রাম যান। সাময়িক সমঝোতা দেখা গেলেও এখন ওই দ্বন্দ্ব পুরনো রূপ পেয়েছে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের সঙ্গে জেলা সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদের বিবাদ লেগেই থাকে। তাদের একজন কোনো অনুষ্ঠানে গেলে অন্যজন তা বর্জন করেন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি নেই সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর। বিষয়টি একাধিকবার মীমাংসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ।

সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কোন্দল এখন প্রকাশ্যে। সাংগঠনিক সম্পাদক মেসবাহ উদ্দিন সিরাজ আগামী নির্বাচনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা করায় চরম মারমুখী অবস্থানে মুহিত গ্রুপ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হকের সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বিরোধ পুরনো। সম্প্রতি সংখ্যালঘুদের ঘরে আগুন দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই দুই নেতার দ্বন্দ্ব চরমে। কিছুদিন আগে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের জনসভা বর্জন করে প্রতিপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ বিরোধ দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন দলের ত্যাগী নেতাকর্মী।

অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত ৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি নির্বাচন ভরাডুবি হয়েছে আওয়ামী লীগের। কেন্দ্রীয় নেতাদের দীর্ঘ এক মাস নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণাও কাজে আসেনি। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আফজাল খান ও সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের দ্বন্দ্বই কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে নৌকার পরাজয়।

এরই মধ্যে সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গাসহ কয়েকটি জেলার নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সামনে নির্বাচন। তাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এসব কোন্দল আর গোপন বিষয় নয়, দীর্ঘদিন ধরেই তা চলে আসছে। জাতীয় নির্বাচনের আরও দেড় বছর বাকি। তাই এই কোন্দল নিরসনের সুযোগ রয়েছে।

তৃণমূলের কোন্দল প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বলেন, তৃণমূলে কোন্দল নিরসনে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা সফর করছেন। বেশি বিরোধপূর্ণ জেলাগুলোকে ঢাকায় ডাকা হচ্ছে। তাদের কথা শুনছি। সমস্যা সমাধান করে এমপি-নেতাদের মিলিয়ে দিচ্ছি। তিনি বলেন, কোন্দল অনেকটাই কমে গেছে। বাকিগুলোও দ্রুততম সময়ে মিটিয়ে ফেলা হবে।

সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এ উদ্যোগ তেমন সফল হয়নি। এরই মধ্যে আবার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন জেলা নেতা ও এমপিরা। নীলফামারী জেলা নেতাদের সঙ্গে এমপিদের বিরোধ চলছে আগের মতোই। নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক স্থানে বেড়ে গেছে। এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মমতাজুল হক গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, দল ক্ষমতায় থাকায় এমপি-মন্ত্রীরা বেপরোয়া হয়ে গেছে। তারা দলের নেতাকর্মীদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। জামায়াত-শিবির নিয়ে বলয় সৃষ্টি করেছেন। ত্যাগী নেতাকর্মীদের হামলা-মামলা দিয়ে নির্যাতন করছেন। নেতাকর্মী ও ভোটার বিচ্ছিন্ন এসব এমপিকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দিলে দল হারবে।

মাদারীপুর জেলায় নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা আফম বাহাউদ্দিন নাছিমের দ্বন্দ্ব এখন চরমে। গত পৌর নির্বাচনে বাহাউদ্দিন নাছিম দাঁড় করিয়েছিলেন তার ভাইকে। মন্ত্রী সমর্থন করেছিলেন আরেক প্রার্থীকে। এই দুই শিবিরে পুরো মাদারীপুর জেলা বিভক্ত হয়ে আছে। গত ১৩ জুলাই ধানম-ির কার্যালয়ে দলের সম্পাদকম-লীর সভায় শাজাহান খানকে দানব বলে আখ্যায়িত করেন বাহাউদ্দিন নাছিম। জেলায় নেতাদের মধ্যে বলয় সৃষ্টির অভিযোগও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে।

এদিকে জেলার শীর্ষ নেতাদের কোন্দল নিরসনে গত ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের সাংগঠনকি সম্পাদকরা জেলা সফর করেন। মানিকগঞ্জ, জামালপুর, নরসিংদী, পাবনাসহ ১৩টি জেলা সফর করে নেতাদের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সেই কোন্দল ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

জেলা নেতাদের সঙ্গে এমপি-মন্ত্রীদের এই বৈরী সম্পর্ক নিরসনের নানা উদ্যোগ বারবার ভেস্তে যাওয়ায় বেশ চিন্তিত আওয়ামী লীগ। চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আগামী নির্বাচনের আগে এই দ্বন্দ্ব নিরসন করা না হলে দলে বিপর্যয় ঘটতে পারে বলেও মন্তব্য অনেক নেতার। নির্বাচনের আগে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে কঠোর সিদ্ধান্তÍ নিতে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

print