FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

১৩ জুলাই, ২০১৭ - ৯:০১ পূর্বাহ্ণ

দাঙ্গা হাঙ্গামা

Bd-pratidin-13-07-17-F-22

x

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা। তসলিমা নাসরিন

পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটে দাঙ্গা হলো, হিন্দু মুসলমান দু’দলই আগুনে পুড়িয়েছে পরস্পরের দোকানপাট, ঘরবাড়ি, পুড়িয়েছে মোটরগাড়ি। মোট ক’বার দাঙ্গা হয়েছে ভারতবর্ষে তার হিসাব নেই। দাঙ্গার কারণে ভারত ভাগ হলো। তারপরও দাঙ্গা থামেনি। আমি তাদের যুক্তি মেনে নিতে পারি না যারা বলে ইংরেজরা ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি তৈরি করেছিল যেন হিন্দু-মুসলমান একজোট হতে না পারে ইংরেজদের বিরুদ্ধে, এই ভেদ-নীতির কারণেই দাঙ্গা হয়েছে, ভারত ভাগ হয়েছে— তাদের প্রশ্ন করি, ইংরেজ তো চলে গেছে অনেক বছর, তারপরও দাঙ্গায় ভুগতে হয় কেন ভারতবর্ষকে?

দাঙ্গা সেই কতকাল হচ্ছে, মোগল আমলে হয়েছে, ইংরেজ আমলে হয়েছে, ভারত ভাগের সময় হয়েছে, আজ অবধি হচ্ছে। ভারতভাগ ১০ লাখ মানুষকে দাঙ্গায় ফেলে মেরেছে, ১ কোটি মানুষকে গৃহহীন করেছে। স্বাধীন ভারতে হিন্দু-মুসলমানের প্রথম বড় দাঙ্গা হয়েছিল মধ্য প্রদেশের জব্বলপুরে, ১৯৬১ সালে। ১৯৬৯-এ আহমদাবাদে দাঙ্গা হয়। এক হাজার লোক মারা গেছে সেই দাঙ্গায়। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা জামসেদপুরে বেধেছিল ১৯৭৯ সালে, মোরাদাবাদে ১৯৮০ সালে। শুধু যে হিন্দু আর মুসলমান দাঙ্গা বাধায় তা নয়। ১৯৮৪ সালে, ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর দিল্লিতে দাঙ্গা বাধে অক্টোবরের ৩১ তারিখে। দু’সপ্তাহে মারা যায় প্রায় তিন হাজার মানুষ। ১৯৮৭ সালে উত্তরপ্রদেশের মিরাটে দাঙ্গা বাধে, সে দাঙ্গা দু’মাস টিকেছিল। ১৯৮৯ সালে ভাগলপুরের দাঙ্গায় মারা যায় এক হাজার লোক। ৫০,০০০ লোক উদ্বাস্তু হয়, ১১,৫০০ বাড়ি পুড়ে যায়। ১৯৯২ সালে বোম্বাইয়ে যে দাঙ্গা হয়, ওতে ১৭৮৮ লোক মারা যায়। কোটি টাকার সম্পত্তি নষ্ট হয়। আর ২০০২-এর গুজরাট দাঙ্গার কথা তো জানিই সকলে। গোধরার ট্রেনে ৫৮ জন হিন্দু তীর্থযাত্রীকে পুড়িয়ে মারার ফলে দাঙ্গা বাধে হিন্দু মুসলমানে। এক হাজারের চেয়েও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, ২৫০০ লোক আহত হয়। গৃহহারা হয় অসংখ্য মানুষ। ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের ক্যানিং আর উত্তরপ্রদেশের মুজাফফরনগরে দাঙ্গা হয়। ক্যানিংয়ে মারা যায় ৮ জন, আহত হয় ৪২ জন। মুজাফফরনগরে মারা যায় ৬২, আহত ৯৩। এসব বলে শেষ করা যাবে না। ধর্মান্ধ লোকেরা দাঙ্গা করে। মূর্খ লোকেরা করে। জানি। আমরা এও জানি দাঙ্গা করতে ইন্ধন জোগায় ধর্মীয় গুরুরা, আর ধর্মীয় গুরুদের যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার জোগায় রাজনৈতিক নেতারা। হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বাস করে আসা হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে আজ এত অশান্তি কেন! দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসে আর ঘৃণা বাড়িয়ে কিছু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করে কিছু লোক।

আমি সাধারণ এক লেখক। রাজনীতি করি না। কারো সাতে নেই, পাঁচে নেই। এই নিরীহ নির্ঝঞ্ঝাট মানুষকে নিয়েই যদি ভারতে দাঙ্গা বাধতে পারে, তবে কী না নিয়ে পারে! ২০০৭ সালে কলকাতায় আর ২০১০ সালে কর্ণাটকে দাঙ্গা বেধেছিল। ২০০৭ সালে মুসলমান ছেলেরা পার্ক সার্কাস এলাকা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় একটার পর একটা গাড়ি পুড়িয়েছে, পুলিশকে ইটপাটকেল ছুড়েছে। এক সময় ‘তসলিমা গো ব্যাক’ লেখা কাগজ উঁচু করে ধরলো। পুরো কলকাতা শহর সারা দিন স্তব্ধ হয়ে রইলো। এক সময় স্পেশাল পুলিশ নামলো, আর্মি নামলো। ওই দাঙ্গাবাজদের দাবি মেনে এত বড় একটা শক্তিশালী রাজ্য একজন মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী লেখককে রাজ্য থেকে বের করে দিল, জিহাদি দাঙ্গাবাজদের মাথায় পরিয়ে দিল বিজেতার মুকুট।

কর্ণাটকে হিন্দু-মুসলমানে দাঙ্গা লেগেছিল ২০১০ সালে। ওখানকার কোনও একটা পত্রিকা আউটলুকে ছাপা হওয়া আমার একটি পুরনো কলাম কন্নড় ভাষায় অনুবাদ করে ছাপিয়েছিল। ওই কলামে বোরখা সম্পর্কে আমার যে মত আমি প্রকাশ করেছি, তা ধর্মান্ধ কট্টরপন্থিদের পছন্দ না হওয়াটাই স্বাভাবিক। স্থানীয় একজন কংগ্রেস নেতার সিদ্ধান্তেই একদিন দাঙ্গাবাজ মুসলমানেরা পথে নামে। মুসলমানেরা হিন্দুদের বাড়ি গাড়ি পোড়াচ্ছিল বলে হিন্দুরাও নেমে পড়ে মুসলমানদের বাড়িগাড়ি পোড়াতে। দাঙ্গাবাজরা, আমার বিশ্বাস, পড়েওনি আমি কী লিখেছি। পড়লেও কিছু বুঝেছে বলে আমার মনে হয় না। আসলে দাঙ্গার কারণ লেখালেখি নয়, দাঙ্গার কারণ নোংরা রাজনীতি। এত তুচ্ছ কারণে যদি দাঙ্গা ঘটে যেতে পারে, তবে দাঙ্গা নিয়ে ভয় হওয়া অমূলক নয়। ভয় সবারই হয়। ভয় হয় বলেই দাঙ্গা বাধলে প্রচারমাধ্যমকে বলাই আছে দাঙ্গার প্রচার না করার জন্য। মুজাফফরনগরের দাঙ্গার সময় দেখেছি মিডিয়ার মুখে কুলুপ। ধুলাগড়, ক্যানিংয়ের দাঙ্গার সময়ও। দাঙ্গা বন্ধ করতে ভারতের সব সরকারই খুব ভালো ভূমিকা নেয়। তবে মুশকিল হলো, দাঙ্গা বাধতে পারে, এমন সব কাণ্ডে উসকানিও কিন্তু কিছু কম দেয় না তারা। কেউ কেউ বলে, ভারতের স্বদেশি আন্দোলনের সময় হিন্দু জাতীয়তাবাদ মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দিয়েছিল। আর এদিকে আজকাল দেখি, মুসলিম তোষণনীতির কারণে হিন্দু সাম্প্রদায়িক দল হিংস্র হয়ে উঠেছে। গো-রক্ষার নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যা চালাচ্ছে।

ভারতের ২৭ কোটি লোক দরিদ্র। ৬৩ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ খাবার জল পায় না। বয়স পাঁচ হওয়ার আগেই প্রতিদিন তিন হাজার ছ’শ একাত্তর জন শিশু মারা যাচ্ছে। অর্ধেকই পুষ্টির অভাবে। প্রতি ১১ জন শিশুর মধ্যে ১ জন ইস্কুলে যাওয়ার বদলে শ্রমিকের কাজ করতে বেরোয়। শতকরা ৪৭ ভাগ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার। শতকরা ৪৪ ভাগ মানুষ বিনা বিদ্যুৎ-এ বসবাস করে। ৮০ কোটি লোকের কোনও টয়লেট নেই। দারিদ্র্য না ঘুচিয়ে, শিক্ষা আর স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত টাকা না ঢেলে টাকা ঢালা হয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, গড়া হয় অগুনতি মসজিদ মন্দির। ভাতা দেওয়া হয় ধর্মীয় গুরুদের। মানুষকে ধর্মান্ধ হওয়ার জন্য ক্রমাগত উৎসাহ দিতে থাকলে বা চাপ প্রয়োগ করতে থাকলে একদিন না একদিন মানুষের ধর্মান্ধ হয়ে ওঠার, বা ধর্মীয় দাঙ্গাবাজ হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকেই যায়। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার। মানুষের এই বিশ্বাসকে রাষ্ট্র নিজের বিশ্বাস বলে ভুল করে। এই বিশ্বাসকেই তখন এমন নিরাপত্তা দিতে শুরু করে যে অসৎ, ভণ্ড, প্রতারক ধর্ম প্রচারকেরাও ১০০ ভাগ অধিকার পেয়ে যায় যুব সমাজকে নষ্ট করার। এদের বাধা দিতে গেলে বাধা পায় প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক উদারপন্থিরা। সরকার চিরকালই ধর্মান্ধ, কূপমণ্ডূক, নারী স্বাধীনতাবিরোধী, মানবতাবিরোধী, হিংস্র, পাষণ্ড গোষ্ঠীকেই সমর্থন করে আসছে। কারণ ওই গোষ্ঠী যা কিছুই করে, যত অপকর্ম করে, করে ধর্মের নামে। এই ধর্মটুকুকেই দরকার রাজনীতিকদের। এই ধর্মটুকুকে ব্যবহার করে যেহেতু রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়া যায়, তাই মানুষের দারিদ্র্য না ঘুচিয়ে, শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের উন্নতি না ঘটিয়ে ধর্মের শুশ্রূষা করে। এভাবেই আসলে দাঙ্গাবাজদের আর সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেয় তারা মানবতাবিরোধী কাজে।

রাজনীতিকদের বন্ধ করতে হবে কট্টরপন্থিকে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো ঘৃণ্য কাজ। হিন্দু আর মুসলমানকে শান্তিতে স্বস্তিতে বাস করার পরিবেশ দিতে হবে। ভারতবর্ষ একবার টুকরা হয়েছে, ধর্মের নামে যেন একে বারবার টুকরা হতে না হয়।

print