FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ - ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

তক্ষ পেলেই কোটিপতি

x

91771_151মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : তক্ষ পেলেই কোটিপতি। গুজবটা ছিল ওরকমই। মৌলভীবাজার জেলার সব কয়টি উপজেলার গ্রাম ও শহরে একশ্রেণীর মানুষের মুখরোচক গল্প তক্ষ নিয়ে। একান থেকে ওকানে। কানাকানি, ফিসফাস অতি গোপনে তক্ষের সন্ধানে সবাই। সামপ্রতিক সময়ে গুজবে বিশ্বাসী একদল লোভী মানুষের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটির প্রতি। তাই ওরা দিনরাত প্রাণীটি খুঁজছিল। গেল প্রায় তিন বছর থেকে জেলার ৭টি উপজেলায় প্রাণীটি ধরতে শুরু হয় গোপনে চিরুনি অভিযান। পাহাড়ি টিলার বন জঙ্গল আর হাওর, খাল-বিল, নদী-নালার বৈচিত্র্যপূর্ণ এ জেলায় অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের মতো এ প্রাণীরও ছিল অবাধ বিচরণ। নিরাপদে বসবাসকারী এই প্রাণী এখন একদল মানুষের অত্যাচারে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রাণী বিশেষজ্ঞরা। কুলাউড়া উপজেলার লোয়াইউনি চা বাগান, সিরাজ নগর চা বাগন, লংলা চা বাগান সহ জেলার অন্যান্য কয়েকটি বাগানের বাসিন্দারা জানান, প্রায় ২-৩ বছর আগ থেকেই অপরিচিত একদল লোক বাগান এলাকায় হন্য হয়ে তক্ষ খোঁজতে থাকে। চা বাগানের বড় বড় ছায়া বৃক্ষ ও রাবার বাগানের পুরাতন বড় গাছ গুলি তাদের লক্ষ্য ছিল। তারা স্থানীয় লোকজনকে বড় মাপের আর্থিক প্রলোভন দেখায়। ৪শ’ থেকে ৬শ’ গ্রাম ওজনের তক্ষ দিলে তারা ১৫-২০ লাখ টাকা দেবে। ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের নাছনী গ্রামের স্কুল শিক্ষক মাশহুদ করিম, সাতরা গ্রামের কলেজ শিক্ষক প্রভাষক আবদুল মনাফ, গবিন্দপুর গ্রামের ব্যবসায়ী অজি উদ্দিন, মিনহাজ উদ্দিন কমরু, আবদুল মালেক খোকন, মোক্তাদির হোসেন মনা, আতিক মিয়া ও আবদুল আহাদসহ অনেকেই জানান স্রেফ গুজবে আশ্বস্ত হয়ে প্রায় বছর তিনেক আগে থেকে একদল লোক এ প্রাণীটি নিধনে মরিয়া হয়ে ওঠে। রাতে এক সঙ্গে অনেক তক্ষের ডাকের আওয়াজ কানে আসত। চৈত্র মাসে তক্ষের ডাক বেশি শোনা যেত। তারা জানান, ছোট এ প্রাণীটির পরিচিতি আগে গ্রাম ছাড়া শহরে ব্যাপক ভাবে না থাকলেও এখন বড় মাপের আর্থিক লোভে সব জায়গার ছোট বড় সবাই এ প্রাণীটিকে খুব ভাল করে চিনে। এখনো মাঝে মধ্যে তাদের গ্রাম সহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে অপরিচিত লোকজন তক্ষ খোঁজে। এ প্রাণী দিয়ে কি তৈরি হয় এমন প্রশ্ন তক্ষ সন্ধানীদের করলে তারা একেক জন একেক বক্তব্য দেন। কেউ বলেন তক্ষ দিয়ে ইয়াবার মতো দামি নেশা দ্রব্য তৈরি হয়। অন্যরা বলে তক্ষের রক্ত মাংস দিয়ে জটিল রোগের ঔষধ তৈরি হয়। কেউ বলে এটা বিদেশীরা কিনে। কিন্তু কোথায় বিক্রি হচ্ছে, কারা কিনছে এমন প্রশ্নের কোন উত্তর মিলেনি। তবে তারা জানালেন আগেরমতো এখন আর এ প্রাণীটির ডাক তাদের কানে আসে না। এই প্রাণীটির ডাকের আওয়াজ না থাকায় এখন আর আগের মতো তক্ষ সন্ধানীরা এখন আর তাদের এলাকায় আসে না। আর তারাও আগে এ প্রাণীটির গুজবে বিশ্বাসী লোকদের কারণে যে চিরতরে বিলিন হয়ে যাচ্ছে তা জানতেন না। তারা জানালেন এখন ওই লোকদের ধরে পুলিশে সোপর্দ করে এই গ্রাম বাংলার চির চেনা প্রাণীটিকে বাঁচাতে এখন তারা সতর্ক রয়েছেন। জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রাণী গবেষক ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আবু সাদাত মনিরুজ্জামান খান জানান, স্থানীয় ভাবে এটিকে অনেকেই নাইট হিরোন (ঘরমযঃ ঐরৎড়হ) বা নিশি বক বলেন। এ নিশাচর সরীসৃপ প্রাণীটি সিলেট অঞ্চলে ককা বা কক্কে বলে পরিচিতি। এর বৈজ্ঞানিক নাম গ্যাকো মবশশড়.মবপড়শ(খওঘঘঅঊটঝ-১৭৫৮), (তক্ষক সাপ বা তক্ষ সাপ)। ইংরেজি নাম ডঅখখ খওতঅজউ. ঞটঈকঞঙঙ. এঊঈকঙ চার পায়ে ভিরু ভিরু চলে ওরা। পুরাতন গাছের মগ ডালের গর্তে কিংবা পুরাতন পরিত্যক্ত ঘরের ছাদে ওদের নিরাপদ আশ্রয়। দিনের বেলায় ওদের খুব একটা দেখা যায় না। সন্ধ্যা হতে বড় আওয়াজে ওরা একনাগাড়ে ৪-৫ বার কক্কে কক্কে-ওয়াক্কা ওয়াক্কা, ওয়াঅ্যাক…ওয়াক ডেকে নিজ খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। বর্ষা মওসুম ওদের প্রজননের সময়। বছরান্তে ওরা ৪-৫টি ডিম দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। দেহ লম্বায় ১৭ সেমি, লেজও ১৭ সেমি। দেখতে নিরীহ হলেও বিষাক্ত এই প্রাণীটির মাথা বড়, পেট মোটা। ওরা সাধারণত হাওর অঞ্চল অথবা পাহাড়ের সঙ্গে নদী, খাল-বিল মিশ্রিত এলাকায় বাসা বাঁধতে পছন্দ করে। নেংটি ইঁদুর, টিকটিকি, ছোট পাখি, সাপ, পোকা মাকড়, কিংবা ছোট মাছ খেয়ে ওরা তাদের জীবন ধারণ করে। একজন তক্ষ শিকারি জানালেন, পুরানো পরিত্যক্ত ঘরের খোড়লে কিংবা রাতের আঁধারে তারা পাহাড়ি টিলার বন জঙ্গলের পাশ দিয়ে বয়ে জাওয়া খাল বা ছড়ার পাশেই বিশেষ কায়দা কৌশলে ওদের ধরতে ফাঁদ পাতেন। রাতের আঁধারে জোনাকি পোকা আর ছোট ছোট ব্যাঙ ও মাকড়সা ধরে পুরনো গাছের ডালে অথবা নিছে রাখে। আর ওখানে তা খেতে এসে পাতানো ফাঁদে ধরা পড়ে এই নিরীহ প্রাণী তক্ষ। তিনি জানান, তারা যে এলাকায় এ প্রাণীটি ধরতে যান এর ২-১ দিন আগ থেকে ওই এলাকায় প্রাণীটির ডাক শোনে তার বাসস্থান নিশ্চিত হন এরপর কৌশলে শুরু হয় ধরার অভিযান। সংশ্লিষ্টরা জানান কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জসহ জেলার সবকয়টি উপজেলায় এখনও তক্ষের খোঁজে সতর্ক দৃষ্টি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। কুলাউড়া, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলায় অনুসন্ধানে এমন সত্যতা পাওয়া গেল। নাম ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন অনেকেই জানালেন ছোট বড় তক্ষ ধরে এনে তাদের নিজ বাড়িতে গোপনে লালন পালন করছেন। ছোট মাছ, তেলা পোকা ও পোকামাকড় অতি যত্নে তক্ষকে খাইয়েছেন ৩শ’ থেকে ৫শ’ গ্রাম ওজনে পৌঁছার আশায়। কারণ এর চেয়ে কম ওজনের এ প্রাণী বিক্রি হয় না বলে তারা জেনেছেন। তারা জানান, একটি তক্ষ ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা বিক্রি হচ্ছে এমন খবরে তারা বড় মাপের টাকার লোভে বহু কষ্টে পুরাতন গাছের মগ ডালের খোড়ল এবং পুরাতন পরিত্যক্ত ঘরের ছাদ থেকে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে এদের ধরেছিলেন। কে বা কারা কিনছেন কোথায় বিক্রি হয় তা তাদের জানা ছিল না। তাই ধরার পর প্রায় মাস পেরিয়ে গেলেও তারা ক্রেতার সন্ধান পাননি। সিলেট এমসি কলেজ ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান স্রেফ গুজবে বিশ্বস্ত হয়ে লোকজন যেভাবে প্রাণীটি নিধনে নেমেছে তাতে অচিরেই এদেশ থেকে ছোট্ট এ প্রাণীটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।

print