FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

১৯ জানুয়ারি, ২০১৭ - ৮:১৮ পূর্বাহ্ণ

কৃষকের বিরুদ্ধে সোয়া ১৮ লাখ মামলা

image-5

x

কৃষকের বিরুদ্ধে সোয়া ১৮ লাখ মামলা

 

নিজস্ব প্রতিনিধি: সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বকেয়া ঋণ আদায়ে কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করছে। এর মধ্যে শুধু গত নভেম্বরই ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা আদায়ে ৪৯৩টি মামলা দায়ের করেছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত কৃষকের বিরুদ্ধে ৫৬৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা আদায়ের জন্য সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো ১৮ লাখ ২৯ হাজার ২২টি মামলা করেছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই রয়েছে সার্টিফিকেট মামলা। এসব মামলায় অনেক কৃষকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া ভুয়া ঋণ দেওয়ার ফলে যেগুলো খেলাপি হয়েছে সেসব বিষয়েও কিছু বেনামি মামলা করা হয়েছে। এগুলোকে ডিসট্রেসড ওয়ারেন্ট বলে। এই ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না বলে ব্যাংকগুলো নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য এসব মামলা করেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, কৃষকদের হয়রানি বন্ধে ২০১৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩টি প্রজ্ঞাপন জারি করে কৃষকদের বেশ কিছু সুবিধা দিয়েছে, যেগুলো এখনো বহাল আছে। এতে কৃষকের নামে কোনো মামলা করতে বারণ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ করে কৃষকদের বিরুদ্ধে সামান্য কিছু অর্থ আদায়ে করা মামলার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মোটেও ভালো খবর নয়। ব্যাংকের কতিপয় শাখা ব্যবস্থাপকের কারণেই মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি কোনো ব্যবস্থাপক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা উপো করে নতুন করে কৃষকের বিরুদ্ধে আরও মামলা করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেবে।

কৃষকের বিরুদ্ধে ব্যাংকগুলো গণহারে মামলা করলেও বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস পাচ্ছে না। কৃষকের বিরুদ্ধে যেসব মামলা করা হয়েছে, তাতে গড়ে প্রতিটি মামলার বিপরীতে টাকার পরিমাণ ৩১ হাজার টাকা। কোনো কোনো কৃষকের বিরুদ্ধে ১০ হাজার টাকার জন্যও মামলা করার নজির রয়েছে। অথচ শীর্ষ খেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা যেমন কম, তেমনি মামলার বিপরীতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ইস্যু করা হচ্ছে না। ব্যাংকিং খাতে শীর্ষ ৫০ খেলাপির কাছে আটকে থাকা ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এদের বিরুদ্ধে ৪৭ মামলা দায়ের করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৫ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এর ১৯ শতাংশই শীর্ষ ৫০ খেলাপির কাছে। আর কৃষকের কাছে বকেয়া ঋণের পরিমাণ মোট খেলাপির মাত্র ০.৮৬ শতাংশ। এই টাকা আদায়ে দায়ের করা হয়েছে ১৮ লাখ ৩০ হাজার মামলা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, বড় ঋণ খেলাপিরা ঋণ মওকুফ পাচ্ছে। তাদের ঋণ অবলোপন হচ্ছে। আর কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে এটা হতে পারে না। কৃষকের অবদানের কথা বিবেচনা করে তাদের ঋণ আদায়ে শিথিলতা দেখানো উচিত।

সূত্র জানায়, কৃষকের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে মামলা দায়েরের সংখ্যা বেড়ে গেলে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার কৃষকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে যেসব মামলা আগে দায়ের করা হয়েছে সেগুলোর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তুলে নিতে হবে এবং কৃষকের সঙ্গে আলোচনা করে ঋণ আদায় করতে হবে। যেসব কৃষক ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন তাদের ঋণ কোনো রকম ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই নবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের নতুন ঋণ দিতে হবে; কিন্তু ব্যাংকগুলো এই নির্দেশ না মেনেই নতুন করে মামলা করছে।

সূত্র জানায়, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এসব মামলা করেছে।

সোনালী ব্যাংকের নভেম্বর পর্যন্ত ৩৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আদায়ে ১৬ হাজার ৯১৭টি সার্টিফিকেট মামলা করেছে। এর মধ্যে শুধু নভেম্বরে করেছে ১২টি। এর বিপরীতে টাকার পরিমাণ ৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা। তাদের দায়ের করা মামলার মধ্যে নভেম্বরে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯৫টি। এর বিপরীতে টাকার পরিমাণ ১৮ লাখ ১২ হাজার। এছাড়া ১৯৯১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডিসট্রেসড ওয়ারেন্ট হয়েছে ৯৬০টি। এর বিপরীতে টাকার পরিমাণ ৩ কোটি ৯৯ লাখ।

জনতা ব্যাংক ৪১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আদায়ে মামলা করেছে ১৮ হাজার ১০৯টি। নভেম্বরে মামলা করেছে ২৫টি। এর বিপরীতে টাকার পরিমাণ ৭ লাখ ৫০ হাজার। একই সময়ে ২০ লাখ ৪৪ হাজার টাকার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১৬টি মামলা। ডিসট্রেসড ওয়ারেন্ট আছে ১ হাজার ৬৯৬টি। এর বিপরীতে টাকার পরিমাণ ৩ কোটি ২৮ লাখ।

অগ্রাণী ব্যাংক ৪৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা আদায়ে ৩০ হাজার ৯৪টি মামলা করেছে। নভেম্বরে ৩২৯টি মামলা নিষ্পত্তি করে আদায় হয় ৮ লাখ টাকা। ৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আদায়ে ১ হাজার ৬২০টি ডিসট্রেসড ওয়ারেন্ট রয়েছে।

অগ্রাণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, আগের কিছু মামলা এখনো আছে। তবে নতুন করে কোনো মামলা করা হচ্ছে না। এখন আগের মামলাগুলো সমঝোতার মাধ্যমে মীমাংসা করার কাজ হচ্ছে।

রূপালী ব্যাংক ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা আদায়ে ৩ হাজার ২৬৪টি মামলা করেছে। শুধু নভেম্বরে ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকার ৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ডিসট্রেসড ওয়ারেন্ট রয়েছে ৩৬৯টি। এর বিপরীতে টাকার পরিমাণ ৫০ লাখ ১১ হাজার।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ২৯৪ কোটি ৭ লাখ টাকা আদায়ে ৮৫ হাজার ১৮০টি মামলা করেছে। এর মধ্যে শুধু নভেম্বরেই মামলা করেছে ২৭৩টি। এর বিপরীতে টাকার পরিমাণ ৪ কোটি ৭৭ লাখ। এই সময়ে ৪ কোটি ১২ লাখ টাকার ৬৮১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এই পর্যন্ত ১৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা আদায়ে ডিসট্রেসড ওয়ারেন্ট রয়েছে ৫ হাজার ৩৩৭টি।

এছাড়া রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ১৪৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা আদায়ে ২৯ হাজার ৩৫৮টি মামলা করেছে। গত নভেম্বরে ২ কোটি টাকা আদায়ে নতুন মামলা হয় ১৮২টি। ওই সময়ে ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকার ৩৪৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এই পর্যন্ত ১০ কোটি ৯১ লাখ টাকা আদায়ে ডিসট্রেসড ওয়ারেন্ট রয়েছে ২ হাজার ৩৪৭টি।

print