FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

৯ ডিসেম্বর, ২০১৬ - ৪:০৬ অপরাহ্ণ

এক অভাগা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আমি

muktokotha-home

x

এক অভাগা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আমি

নিজস্ব প্রতিবেদক : আর মাত্র কয়েকদিন পর বাঙালি জাতি সগৌরবে ৪৫তম বিজয় দিবস উদযাপন করবে। আমিও চেষ্টা করি যতটা সম্ভব আনন্দের অংশীদার হতে। মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। বইপত্র আর লোকমুখে যুদ্ধের ইতিহাস শুনে(বিশেষ করে বাবার মুখে) বুকটা আনন্দে ভরে উঠে। কিন্তু কোথায় যেন একটা কষ্ট লুকিয়ে থাকে। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি বার বার যেন পেছন থেকে ডেকে বলে না তোমার জন্য বিজয় দিবস নয়। তুমি কিসের জন্য বিজয় দিবস উদযাপন করবে?

তাহলে শোন, তোমাকে এক টগবগে যুবকের গল্প বলি।-তখন তার বয়স মাত্র ২০ বছর। দেশে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মার্চ পেরিয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়। চারদিকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ছেলেটির ঘরে মন বসে না। নানান চিন্তা মাথায় বাসা বাঁধতে থাকে। মনে মনে চিন্তা করলো যুদ্ধে যাবে। কিন্তু কীভাবে? এক তো বাড়ির ছোট ছেলে বলে সবার আদর অন্যদিকে বৃদ্ধ মায়ের কথা মনে করে এক পা বাড়ালে দু’পা পিছিয়ে আসে। কিন্তু ২০/২১ বছরের তরুণ বলে কথা! কোন মোহ তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। অবশেষে সমবয়সী কয়েকজনকে সাথে নিয়ে বাড়ির সবার অগোচরে একদিন পরিবারের মায়া ছেড়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। সেই যে গেল। ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ৩নং সেক্টরে যুক্ত হয়ে যুদ্ধের বাকিটা সময় কাটিয়েছেন রণাঙ্গণে। কি সে কষ্ট, একদিন খেলে তো দুইদিন খাবার নেই। কখনো পচা লাশের পাশে, কখনো মানুষের মলমূত্র, কখনোবা ঝোঁপঝাড়ে রাত কাটাতে হয়েছে। এর মাঝে এক সাথী(সহমুক্তিযোদ্ধা) গ্রাম থেকে ঘুরে এসে খবর দেয় তার মা তার জন্য প্রাগলপ্রায়। তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছে। তখন পৃথিবীটা যেন ভেঙে পড়ে তার মাথায়। কি করবে কিছুই ভেবে পায় না। হ্যাঁ, সব দোষ তারুণ্যের। বিজয় ছাড়া সামনে সে কিছুই দেখে না। তাই বিজয়ের অপেক্ষায় রইল। দেখতে যাওয়া হলো না মাকে এই ভেবে যদি আর আসতে না দেয়? ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর থেকেই খবর এলো মুক্তিযোদ্ধারা

ঢাকামুখী যাত্রা শুরু করেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তারা যাত্রা শুরু করলো। ১৯৭১ এর ১৫ ডিসেম্বর বিকেলবেলা ঢাকায় পৌঁছাল তাদের দল। ঢাকা ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজে তাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। ইতোমধ্যে, চারদিক থেকে বিজয়ের বার্তা আসতে শুরু করেছে। সেকি আনন্দ তার চোখেমুখে। বিজয়ের সংবাদ হয়তো আর চাপা দিয়ে রাখতে

পারছিলেন না। তাই তো সেদিন রাতেই ক্ষণিকের অনুমতি নিয়ে মাকে দেখতে ছুটে এলেন ঢাকার অদূরে মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার টেংগারচর নামের প্রত্যন্ত এক গ্রামে।

দীর্ঘ ৯ মাস পর সন্তানের দেখা পেয়ে মা যেন নতুন জীবন ফিরে পেল। কিন্তু অভাগী মায়ের সে আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রাতেই ফিরে যেতে হলো তাকে। বাড়ির সবাই আবার ফিরে যেতে নিষেধ করলেও তাকে যে যেতেই হবে। এখনো যে বিজয়ের চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। তাই সে রাতেই ফিরে গেলে তাদের অস্থায়ী ক্যাম্প ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজে। অবশ্য, এই ৯ মাসের মধ্যে প্রশিক্ষণকালীন সময় ছাড়া আর কোথাও স্থায়ী ঠিকানা হয়নি। অবশেষে ১৬ তারিখ বিকেলে এলো চূড়ান্ত বিজয়ের ঘোষণা। বিজয়ের আনন্দে ভাসলো বাঙালি জাতি। বিশ্বের বুকে সৃষ্টি হলো বিজয়ের নতুন ইতিহাস। ১৬ তারিখ রাতেই আবার যাত্রা শুরু। সেখান থেকে সোজা যশোর ক্যান্টনমেন্ট। বাকি যে কয়েকদিন চাকরি করেছিল সেখানেই ছিল।

পরের ইতিহাস সবারই জানা। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন যে সকল মুক্তিযোদ্ধারা উন্নত জীবনের জন্য সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে চলে যেতে চায় বা পূর্বের পেশায় যেতে চায় তারা যেতে পারেন। দূরন্তপনা সেই যুবকটি তখন চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসে বাড়িতে। এতোক্ষণ তোমাকে যে যুবকের গল্প শুনাইলাম সে আর কেউ নয় রণাঙ্গণে যুদ্ধ করা তোমারই বাবা। তুমি সেই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস সেই তুমিই কিনা আজ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে পরিচয় দিতে পারো না। কারণ সার্টিফিকেট নামের যে সোনার হরিণ সেটি নাই তোমার বাবার! অবশ্য তোমার মতো আরও অনেকেই আছে যারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে পরিচয় দিতে পারে না।

হ্যাঁ, বন্ধুরা রণাঙ্গণে যুদ্ধ করা এক অভাগা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আমি। আমরা দশ ভাইবোন। বিধিবাম আমরা সেই পরিচয় কারো সামনে দিতে পারি না। কারণ আমার বাবার যে সার্টিফিকেটটি ছিল তা হারিয়ে ফেলার পর অনেক চেষ্টা করেও তা আজও তুলতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল কত জায়গায় না ঘোরাঘুরি করলো আমার বাবা! কত আবেদন করলো এ পর্যন্ত তার কোন হদিস নেই! না পায়নি। আজও বাংলাদেশ সরকার আমার বাবাকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিতে পারেনি। অথচ সরকারের দায়িত্ব ছিলো জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের খুঁজে বের করার।

আপনারাই বলুন প্রতি বছর যে বিজয় দিবস আসে সেটা কি আমাদের জন্য? সেই সকল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্যে যারা রণাঙ্গণে যুদ্ধ করেও আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায়নি?

লেখক: তাজুল ইসলাম নাজিম

print