FaceBook twitter Google plus utube RSS Feed
  

১৬ জুলাই, ২০১৭ - ১:৩৭ অপরাহ্ণ

অঝোর দিনের গান

Risingbd20170716075558

x

অঝোর দিনের গান

তোলপাড় ডেস্ক :রবীন্দ্রনাথ তাঁর বর্ষার গানে প্রাচীনকালের কবিদের বর্ষার আনন্দ আর প্রেমের আবহ নতুন করে রূপায়িত করেছেন। তাতে প্রাচীন কাব্যনায়িকাদের মিলন-বিরহের স্মরণ, বর্ষা-অভিসারের প্রসঙ্গ, সর্বোপরি বর্ষাচিত্রের বিচিত্র অলঙ্করণ অতীতকালের সঙ্গে বর্তমানকে একসূত্রে গ্রোথিত করেছে। তাঁর কাব্য আলোচনা করতে গিয়ে এসব কথা লিখেছেন বহুজন। রবীন্দ্রনাথের এরকমের গানে কলাপধারী ময়ূর, কদম্ববন, পথিকললনা, জনপদবধূ আর নীলাম্বরী পরিহিতা অভিসারিকাদের আনন্দোৎসবের সুর ঝঙ্কৃত হয়ে উঠেছে। ‘ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে’ গানটির কথা স্মরণ করছি। গানের শেষে বৃষ্টিমুখরিত বনবীথিকাতে শতেক যুগের কবিদের গীতধ্বনি শুনতে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সে-গান শুধু কালিদাসের নয়, পুরাতনকাল থেকে এ পর্যন্ত সকল কবির কণ্ঠনিঃসৃত। এই সঙ্গে আরো একটি গানের কথা মনে পড়ে-

বহু যুগের ও পার হতে আষাঢ় এল আমার মনে,

কোন্ সে কবির ছন্দ বাজে ঝরো ঝরো বরিষনে॥

এ গানে কালিদাসের কাব্যে চিত্রিত রেবা নদীতীরের মালবিকার পথ চেয়ে থাকা দৃষ্টিতে চিরদিনের বিরহিনীর প্রতীক্ষা মূর্ত হয়ে রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিসুলভ শঙ্কাকুল ভাবনা পরিবেশচিত্রে আরোপ করে অঝোর বর্ষণে পরিপ্লুত আষাঢ় মাসের পল্লীজীবনচিত্র এঁকেছেন। মেঘের অন্ধকার আর আসন্ন দিবাবসানের ঘনায়মান অন্ধকার, ভয়ের ছবি তৈরি করেছে। পিছল-পথ আর প্রমত্তা-নদী পার হওয়ার জন্য পথে বার হতে নিষেধ করছেন পল্লীবাসীকে। গানের ভাষাতে বাস্তবজীবন থেকে দূরত্ব রয়েছে। এখানে ‘গাভী’ হয়েছে ‘ধেনু’ আর তার ‘বাছুর’ পেয়েছে ‘ধবলী’ নাম। গ্রামীণ ‘গোয়াল’ কবিতায় হয়েছে ‘গোহাল’ পল্লীবালার পরিধান ‘নিচোল’। অভিধানে ‘নিচোল’ শব্দের একটি অর্থ ‘ঘাগরা’। এই অর্থের সঙ্গেই আমরা পরিচিত। শব্দব্যবহার থেকে মনে হতে পারে, ঠিক বাংলার পল্লী নয়, বাংলার বাইরের দূরবর্তী কোনো গ্রামে ছবি ভেসে উঠেছে তাঁর কল্পনায়। কিন্তু, বাংলার বাইরের আর কোন অঞ্চলের পল্লীতে জলে ভরো-ভরো আউসের ক্ষেত আর খেয়া পারাপার বন্ধ করে দেওয়া এমন ঢল নামে? নাকি, কবি মথুরা-বৃন্দাবন এলাকার বর্ষণ-উত্তাল যমুনাতীরের পসারিণীদের নিচোলের কথা তুলেছেন?

‘বাঁশঝাড়’ নয় ‘বেনবনে’র কথা রয়েছে ‘নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে’ গানটিতে। ভাষাতে আমাদের পরিচিত পল্লীগ্রাম থেকে দূরত্ব থাকলেও, বাংলার বাইরে পশ্চিমের দিকেও বাঁশবন আর রাখালবালক আছে নিশ্চয়ই। আর রবীন্দ্রনাথ, কবিতায়-গানে ভাষার ঘোর তৈরি না করে পারেন না যেন! অবশ্য এই উপায়ে দূরত্ব থেকে রহস্য ঘনিয়ে ওঠে।

মনে পড়ছে, বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রসাধন সামগ্রীও দূর অতীত থেকে নেওয়া। ‘লোধ্ররেণু’, ‘লীলাপদ্ম’, ‘অঙ্গের কুঙ্কুম’, ‘কেশধূপ’, ‘চন্দনের পত্রলেখা’, ‘কেতকী কেশরে’ সুরভিত কেশ ইত্যাদির কথা স্মরণ করা যায়। বর্তমান কালে পা রেখেও তিনি ছিলেন অতীতচারী।

নজরুলের বর্ষার গানেও ‘ঘাগরী’র উল্লেখ পাই।

‘শাওন আসিল ফিরে’তে আছে ‘ধনী-রঙ ঘাগরী, মেঘ-রঙ ওড়না’। এই ‘কাজরী’ গানখানিতে ঘাগরা আর ওড়নার কথা আসাই স্বাভাবিক। গানের এ ললনা অবাঙালি। দোলনায় দুলবার সঙ্গী বিদেশীবন্ধু ‘কিশোরে’র জন্য কন্যাটির মন উড়ু-উড়ু করে। প্রেমের প্রসঙ্গে বাংলা গানে ‘শ্যামল-কিশোরে’র কথা আসবেই। রবীন্দ্রনাথের গানের ঘাগরা, নজরুলের গানের ঘাগরা আর ওড়না, অতুলপ্রসাদেও আছে।

নজরুলের গানের কথা বলি প্রথমে। ‘আবার শ্রাবণ এলো ফিরে’ গানে স্ত্রী-পুরুষে দ্বৈতকণ্ঠে ‘কাজরী’ গানের বনভূমি মাতিয়ে তুলতে চায়। বাদল-ময়ূরের ডাকে কদমশাখে দোলনা বাঁধবার সাধ জাগে তাদের মনে। কেকাধ্বনি শুনে মনে জাগে গোপগোপী আর ব্রজের কিশোরের কথা, শ্যামের বিশেষ লীলাসঙ্গিনীটির কথা। বর্ষার গানে এইসব স্মরণ যেন অনিবার্য। নজরুল-রচিত ত্রিতালের রাগভঙ্গি তানময় গান ‘এসো হে সজল শ্যাম-ঘন দেয়া’তে নবঘন শ্যামের নূপুরধ্বনি শুনবার আকুতি জেগেছে। হিজল তমাল ডালে ঝুলনা ঝুলানো, যমুনা স্রোতে প্রেমের খেয়া ভাসানোর উল্লাসপূর্ণ আহ্বানও একান্তভাবেই গোপললনার সঙ্গে শ্যামের লীলার স্মারক।

আইনব্যবসা-সূত্রে লক্ষ্মৌপ্রবাসী অতুলপ্রসাদ সেনের ‘পিলু’ রাগের ‘সাওয়ন’ ‘শ্রাবণ ঝুলাতে’ ঝুলনেরই গান। প্রবাসী গীতিকার শ্যামরায়ের সঙ্গে রাধিকার ঝুলা খেলবার ছবি এঁকেছেন তুলনা প্রসঙ্গে। ‘গীতিগুঞ্জে’ মুদ্রিত গানটিতে কয়েকটি ছত্র দেখছি, যা কাউকে গাইতে শোনা যায় না। রাধাশ্যামের উল্লেখ রয়েছে সে-অংশেই।

শ্যাম-পত্র কোলে কুসুম দোলে,

রাধা-সনে যেন শ্যামরায়।

গানটির তানে-লয়েও রয়েছে ঝুলার দোল। এ গানে আছে ভয়-ভাবনা ভুলে জীবনদোলায় দুলবার আমন্ত্রণ। সুখী-দুখী সকলে মিলে ভয়-ভাবনা ছেড়ে জীবনের ঝুলাকে গ্রহণ করবার আমন্ত্রণ অতুলপ্রসাদের ব্যক্তিজীবনের দুঃখের কথা মনে করিয়ে দেয়। দূরে সরে-যাওয়া পত্নীর জন্য বিরহ-কাতরতা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর আরো কয়েকটি বর্ষার গানে। তার ভেতরে বিশেষ করে বলা যায় ‘বধুয়া, নিদ নাহি আঁখিপাতে’ আর ‘বধূ এমন বাদলে তুমি কোথা’ গান দুটির কথা। ‘গীতিগুঞ্জে’ দুটি গানই বিন্যস্ত রয়েছে ‘মানব’ পর্যায়ে। ‘বেহাগ’ রাগের প্রথম গানটিতে একাকিত্বের বেদনা সুরেও নিঃশ্বসিত।

ঘনঘোর মেঘের ডমরুধ্বনির প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল দুজনের গানেই এসেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু’ আর ‘আঁধার অম্বরে প্রচণ্ড ডম্বরু’ গান দুটির কথা প্রথমেই মনে আসে। প্রথম গানটিতে বাণীর ধ্বনিবিন্যাসের বৈশিষ্ট্যে পাখোয়াজের গুরু গুরু শব্দ শোনা যায়। আরম্ভের ছত্রে পরপর পাঁচটি ঝ/র/রু থেকে ডমরু বাদন শুরু হয়। সেই ধ্বনি বাহিত হয়ে চলে ‘ডমরু গুরু গুরু’ বাক্যাংশের সংবৃত উ-কারের সহায়তায়। তারপর প্রতি চরণে একটি-দুটি, কখনো-বা তার অধিক যুক্তাক্ষরের সহযোগে ধ্বনিতরঙ্গ হিল্লোলিত হতে থাকে। যুক্ত বা রুদ্ধ ধ্বনিগুলোতে ন ঞ ঙ নাসিক্যব্যঞ্জন আর রয়ের আধিক্য ধ্বনির রুদ্ধতা ছাপিয়ে খানিক প্রবাহিত হয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। মনে হয়, তার দরুনই গুরু গুরু ধ্বনি সমগ্র গানে বেজে চলতে পেরেছে।

print